সবুজে ঘেরা পাহাড়ি টিলা, আঁকাবাঁকা পথ আর সারি সারি চা গাছ—চা বাগানের এই সৌন্দর্য বহু মানুষের কাছে মুগ্ধতার প্রতীক। প্রতিদিনের ক্লান্তি দূর করতে এক কাপ চা যেমন স্বস্তি এনে দেয়, তেমনি সেই চায়ের পেছনে থাকা শ্রমিকদের জীবন গল্পে ভরা বঞ্চনা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তায়।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িসহ দেশের বিভিন্ন চা বাগানে কাজ করা শ্রমিকদের জীবনযাত্রা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। যুগ বদলেছে, বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, কিন্তু বাড়েনি তাদের মজুরি কিংবা মৌলিক সুবিধা। শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও স্যানিটেশনের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকেও বঞ্চিত অনেক শ্রমিক পরিবার।
বর্তমানে দেশের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭৮ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এত অল্প আয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান শ্রমিকরা।
আন্তর্জাতিক চা দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার চিত্র।
ফটিকছড়ির নেপচুন চা বাগানের শ্রমিক তাহেরা বেগম বলেন, “সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করি। দিন শেষে পাই ১৭৮ টাকা। কাজ না করলে সেই টাকাও মেলে না। এই টাকায় এখন সংসার চালানো খুব কঠিন।”
একই বাগানের শ্রমিক হনুফা বেগম বলেন, “একজনের আয়ের ওপর পুরো পরিবার নির্ভর করে। ভাঙাচোরা ঘরে সন্তান আর গবাদিপশু নিয়ে থাকতে হয়। ঘর মেরামতের কথা বলা হলেও বছরের পর বছর কোনো পরিবর্তন হয় না।”
চা শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ বাগানে শ্রম আইন ও চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে মানা হয় না। মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতেও রয়েছে নানা ঘাটতি।
কর্ণফুলী চা বাগানের শ্রমিক কৃষ্ণ মনি বলেন, “সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একটানা কাজ করি। অনেক সময় দুপুরে খাওয়ারও সুযোগ হয় না। দিন শেষে ১৭৮ টাকা পাই। বাইরে পরিবার নিয়ে থাকলে কষ্ট আরও বেশি।”
বৈলগাঁও চা বাগানের শ্রমিক অঞ্জনি ত্রিপুরা বলেন, “এত কম বেতনে পরিবার চালানো খুব কঠিন। বর্ষা এলেও বাগান থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয় না।”
পঞ্চায়েত নেতা মৃদুল কর্মকার বলেন, চা শিল্পের বিকাশে শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও তাদের জীবনমানের উন্নয়ন এখনো দৃশ্যমান নয়।
শ্রমিকরা জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তাদের ভাষায়, চা গাছ যেমন ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে পারে না, তেমনি তাদের জীবনও যেন নির্দিষ্ট সীমার বাইরে এগোয় না।
জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক চা দিবস পালিত হয় প্রতি বছর ২১ মে। চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই দিবসটি পালন করা হয়।
সবুজ চা বাগানের নান্দনিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শ্রমিকদের সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার গল্প আন্তর্জাতিক চা দিবসে আবারও সামনে এসেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করার দাবি নতুন করে জোরালো হচ্ছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!