আসন্ন বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বৈধ করার সীমিত সুযোগ রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে এ সুযোগকে বিশেষ কোনো ‘অ্যামনেস্টি স্কিম’ হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আয়কর নথিতে সম্পদ প্রদর্শনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা কেনাবেচায় প্রকৃত লেনদেন আড়াল, কম দামে দলিল ও নগদ অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহারের কারণে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়। এই অর্থকে মূলধারার অর্থনীতিতে আনার জন্যই নতুন কাঠামো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই আয়কর রিটার্নে সম্পদের প্রকৃত মূল্য দেখাতে হবে। নির্ধারিত করহার পরিশোধের মাধ্যমে ওই অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কোনো সম্পদ ২ কোটি টাকায় বিক্রি হলেও দলিলে কম মূল্য দেখানো হলে বাকি অংশ অপ্রদর্শিত থেকে যায়। নতুন নিয়মে পুরো মূল্যই রিটার্নে দেখিয়ে প্রযোজ্য কর দিয়ে তা বৈধ করার সুযোগ থাকবে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমান সিস্টেমের কারণেই অনেক অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়। যতদিন এ কাঠামোগত সমস্যা থাকবে, ততদিন এমন অর্থ তৈরি হবেই। তাই শর্তসাপেক্ষে বৈধতার একটি সুযোগ বিবেচনায় রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই আয়কর নথিতে তথ্য প্রদর্শন করতে হবে এবং নির্ধারিত করহার অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ হয়েছে। বিশেষ করে ২০২০-২১ অর্থবছরে এক বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করা হয়।
তবে পরবর্তীতে এ সুবিধার পরিসর কমে আসে। সর্বশেষ অর্থবছরগুলোতে উচ্চ করহার ও শর্তের কারণে এ ধরনের বিনিয়োগও কমেছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নিয়মিত করদাতাদের প্রতি বৈষম্য তৈরি করে এবং কর ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এ ধরনের সুযোগ সাময়িক রাজস্ব বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে কর ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন।”
অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিশেষ কোনো ছাড় ছাড়াই বিদ্যমান করহার অনুযায়ী কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রয়েছে, নতুন করে আলাদা স্কিমের প্রয়োজন নেই।
রিয়েল এস্টেট খাতের সংগঠন রিহ্যাব আবার আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে আগের মতো বিশেষ সুযোগ পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে খাতটিতে স্থবিরতা কাটবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে।
সব মিলিয়ে কালোটাকা বৈধ করার বিষয়ে সরকারের সম্ভাব্য নতুন উদ্যোগ ঘিরে আবারও অর্থনীতি ও নীতিনৈতিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!