বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আগামী জুন মাসে দেশটি সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই সফরে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি অন্যতম অগ্রাধিকার পেতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন তাঁর চীন সফরের সূচি রয়েছে। মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অভিবাসন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ। ২০২৪ সালের মে মাসের পর থেকে নতুন করে কোনো বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে যেতে পারেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাজারটি আর খোলা যায়নি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরে নতুন কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সফরকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেওয়া হয়ে থাকে। সে বিবেচনায় শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে।
সিন্ডিকেট নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ
শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনায় প্রবাসী কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও পুরোনো সিন্ডিকেট–সংক্রান্ত উদ্বেগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের কিছু বিধান সংশোধন না হলে অতীতের মতো সীমিতসংখ্যক এজেন্সির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থেকে যেতে পারে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় পুরোনো সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসতে পারে।
তবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বারবার বলে আসছেন, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
এজেন্সি বাছাইয়ে শর্ত
২০২৫ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে পাঠানো এক চিঠিতে কর্মী পাঠানোর জন্য যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চায়। সেখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গত পাঁচ বছরে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং পর্যাপ্ত অফিস অবকাঠামো।
বাংলাদেশ সরকার পরে কিছু শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায়। বর্তমানে লাইসেন্সধারী ২ হাজার ৫০০ এজেন্সির মধ্য থেকে ৪২৩টি এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দীর্ঘ ইতিহাসের শ্রমবাজার
বাংলাদেশ থেকে প্রথম শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান ১৯৭৮ সালে। দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি হয় ১৯৯২ সালে। এরপর বিভিন্ন সময় শ্রমবাজারটি খোলা ও বন্ধ হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রথমবার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে পুনরায় চালু হয়। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে আবার বন্ধ হয়। পরে ২০২২ সালে চালু হলেও ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে নতুন করে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন।
বৈঠকে আরও যেসব বিষয়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুয়ালালামপুর সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, কৃষি, উচ্চশিক্ষা, হালাল শিল্প, সুনীল অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সফরের সবচেয়ে প্রত্যাশিত ফল হতে পারে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে সেটি কতটা টেকসই ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সমঝোতা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!