ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ‘ফরিদপুরের পাট’-এর স্বীকৃতি বাংলাদেশের পাটশিল্পকে বিশ্ববাজারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ।
তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তুর বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার এই সময়ে জিআই স্বীকৃতি বাংলাদেশের পাটের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্র্যান্ডমূল্য আরও বৃদ্ধি করবে।
বুধবার (১৫ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
কৃষি সচিব বলেন, পাট বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় ‘সোনালি আঁশ’ দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত ছিল। বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুর বিস্তারের কারণে পাটের গুরুত্ব কিছুটা কমে গেলেও জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে আবারও এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২৮২ ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। এর মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য এখনও দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮২০ দশমিক ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ বাস্তবতায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, পরিবেশবান্ধব ও বায়োডিগ্রেডেবল তন্তু হিসেবে পাটের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, সরকার পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং উৎপাদন, গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে সার, চিনি, ধান, চালসহ ১৭টি পণ্যের মোড়কে বাধ্যতামূলকভাবে পাটজাত মোড়ক ব্যবহারের আইন কার্যকর রয়েছে। পাশাপাশি পাটচাষিদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সচিব জানান, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন কাঁচাপাট। উন্নতমানের এই পাটের কার্যকর ব্র্যান্ডিং করা গেলে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) উদ্যোগে ‘ফরিদপুরের পাট’-এর জিআই স্বীকৃতি অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটের স্বাতন্ত্র্য আরও সুদৃঢ় হবে এবং নকল বা ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, জিআই স্বীকৃতি শুধু একটি সনদ নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক পরিচিতি। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঐতিহ্য, গুণগত মান ও উৎপাদন বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান, উদ্যোক্তারা নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান এবং স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়।
তিনি জানান, পাটখাতের পুনরুজ্জীবনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জুটন কাপড় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য পাটের সুতা দিয়ে তৈরি স্কুলব্যাগ চালু এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্পায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সচিব বলেন, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে প্রায় ২৫০ ধরনের পাটপণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী পাটপণ্যের ওপর নগদ সহায়তা বৃদ্ধি এবং ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ‘গ্রিন ইকোনমি’ বা সবুজ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে পাট। তাই কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীল জাত, যান্ত্রিকীকরণ ও জৈবপ্রযুক্তি গবেষণার পাশাপাশি গবেষণার ফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয়—উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!