মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আরও জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এখন কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সৌর প্যানেল আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক ছাড় সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এই সুবিধা শুধু অনুমোদিত প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের জন্যও উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সহজ ঋণ, নেট মিটারিং সম্প্রসারণ এবং দেশীয় উৎপাদনে প্রণোদনা দিলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সরকার ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট, যার মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশই সৌরবিদ্যুৎ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, ৮১৮ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার ১১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এ ছাড়া আরও ১২টি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং অব্যবহৃত সরকারি জমিতে পিপিপি ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতে কর-সুবিধার আওতায় সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শূন্য শুল্ক, পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনে কর ছাড় এবং সৌরবিদ্যুতের বিল ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধে কর রেয়াতের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, গৃহস্থালি পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা গেলে সরকারের বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
এদিকে, সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা গেলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে, একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!