দেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে শিং মাছের বাণিজ্যিক চাষ। তুলনামূলক কম জায়গায় অধিক ঘনত্বে চাষের সুযোগ, বাজারে স্থায়ী চাহিদা এবং লাভজনক উৎপাদনের কারণে এই মাছের দিকে ঝুঁকছেন নতুন ও পুরোনো—দুই ধরনের চাষিই।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর থেকেই বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। মৎস্যচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিং মাছের চাষে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হলেও বাজারমূল্য ভালো থাকায় লাভের সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে আধা-নিবিড় ও নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে ফলন এবং মুনাফা—দুটিই বাড়ে।
ত্রিশালের ধলা, শিং মাছের পোনার বড় কেন্দ্র দেশে শিং মাছের পোনার সবচেয়ে বড় উৎপাদনকেন্দ্র ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলা এলাকা। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পোনা সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি কুমিল্লা, যশোর, নরসিংদী, নোয়াখালী ও সিলেটেও বাণিজ্যিকভাবে শিং মাছের চাষ বাড়ছে।
ধলা গ্রামের অনেক পরিবারই এখন মাছ চাষের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। ছোট একটি পুকুরে ছয় মাস অন্তর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করার উদাহরণও রয়েছে সেখানে। এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে ৩৫টি হ্যাচারি এবং প্রায় ৫০০ পরিবার সরাসরি মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের।
রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মাছচাষি আজিম উদ্দিন বলেন, একসময় ছোট পরিসরে শুরু করলেও এখন তাঁর ৩০টি পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, একই জায়গায় কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় শিং মাছ চাষে লাভ অনেক বেশি।
কীভাবে আসে লাভ
চাষিদের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শতাংশের একটি পুকুরে প্রায় ৫০ হাজার শিং মাছের পোনা ছাড়া যায়। সঠিক পরিচর্যায় ছয় থেকে সাত মাস পর অধিকাংশ মাছ বাজারজাত করা সম্ভব হয়। বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়েও প্রতি ছয় মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ করা যায়। ফলে বছরে মোট মুনাফা দাঁড়াতে পারে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কোহিনুর বলেন, শিং মাছে উচ্চমানের আমিষ থাকলেও চর্বির পরিমাণ কম। সহজপাচ্য হওয়ায় রোগীসহ সব বয়সী মানুষের কাছে এই মাছের চাহিদা বেশি।
তিনি বলেন, নিবিড় চাষের জন্য ২০ থেকে ৬০ শতাংশ আয়তনের পুকুর নির্বাচন, পুকুর প্রস্তুত, নিয়মিত চুন ও লবণ প্রয়োগ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব নিয়ম মেনে চললে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
ড. কোহিনুরের মতে, আধুনিক পদ্ধতিতে নিবিড় চাষ করলে ৫০ শতাংশের একটি পুকুর থেকে সাত থেকে আট মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার কেজি শিং মাছ উৎপাদন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মোট ব্যয় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা হলেও এক ফসলেই ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করা যায়।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পতিত বা অব্যবহৃত জলাশয় কাজে লাগিয়ে শিং মাছের বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে একদিকে যেমন গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে দেশের মাছ উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!