জাতীয়

ময়মনসিংহের ‘শ্রমিকের হাট’: প্রতিদিন বিক্রি হয় শ্রম, অনিশ্চয়তায় কাটে জীবন

আপডেট: জুলা ২৯, ২০২৬ : ০৬:৩৫ এএম
ময়মনসিংহের ‘শ্রমিকের হাট’: প্রতিদিন বিক্রি হয় শ্রম, অনিশ্চয়তায় কাটে জীবন

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড় জমে ওঠে। সকাল ৭টা থেকে সেখানে জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, কেউ আবার খালি হাতেই অপেক্ষা করেন। সবার উদ্দেশ্য এক—দিনের জন্য একটি কাজ জোগাড় করা।

এটি কোনো পশুর হাট বা পণ্যের বাজার নয়। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে। এখানে প্রতিদিন নির্মাণশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, মাটি কাটার শ্রমিক, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা নিজেদের শ্রম বিক্রির আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নেন।

একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরের চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকেই সেখানে কাজের অপেক্ষায় থাকেন অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। কাজ মিললে দিন চলে, আর না মিললে খালি হাতেই ফিরতে হয় বাড়ি।

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক বাবুল মিয়া বলেন, প্রতিদিন সকালে কাজের আশায় এখানে আসেন। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পান, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়। বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা হলেও প্রতিদিন কাজ মেলে না।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষাকালে নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমে যায়। তবে ধান কাটা বা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। বছরের বেশির ভাগ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী।

দিনমজুর আবদুল কুদ্দুস বলেন, তাঁদের কোনো মাসিক বেতন নেই। যেদিন কাজ থাকে, সেদিনই সংসারে খাবার জোটে। কাজ না থাকলে ধারদেনা করে পরিবার চালাতে হয়।

আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিনের ভাষায়, সকালে সবাই কাজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন। যার ভাগ্যে কাজ জোটে তিনি চলে যান, আর যারা থেকে যান, তাদের হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন ও দক্ষতার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকরা তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক পেলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকেই শ্রমিক নেন। এক জায়গায় অনেক শ্রমিক পাওয়া যায় বলে সময়ও বাঁচে।

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়ার মতে, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে কিছুটা বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে আগের তুলনায় এখন কাজের বাজার কিছুটা মন্দ।

শ্রমিকদের মধ্যে কেউ তরুণ, আবার কারও বয়স ৬০ বছরের কাছাকাছি। বয়স বাড়লেও থেমে নেই সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাঁদের দাঁড়াতে হয় এই শ্রমের বাজারে।

দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এই শ্রমিকের হাট। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।

সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাট ফাঁকা হয়ে আসে। কেউ নির্মাণস্থলে, কেউ কৃষিজমিতে, কেউ মাটি কাটার কাজে চলে যান। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তারা পরদিন আবার নতুন আশায় একই জায়গায় ফিরে আসার অপেক্ষায় বাড়ির পথে হাঁটেন।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!