অসাধু ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যেতে একজন কর্মীর অভিবাসন ব্যয় ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই ব্যয় সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
আজ সোমবার সিঙ্গাপুরে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রেমিট্যান্স সম্মাননা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। দৈনিক বণিক বার্তা ও সিঙ্গাপুরের থাকরাল গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে সিঙ্গাপুরে কর্মরত এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মাননা দিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন।
অভিবাসন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ:- শামা ওবায়েদ বলেন, অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কারণে অনেক প্রবাসীকে জমিজমা বিক্রি করে ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যেতে হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ব্যয় কমিয়ে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
অভিবাসীদের সেবা ও সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো একটি ডেডিকেটেড ‘মাইগ্রেশন উইং’ খোলা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এই উইং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ হিসেবে কাজ করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে জনশক্তি ও কর্মসংস্থান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃকর্মসংস্থান, আন্তঃপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তর এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
‘প্রবাসীরা দেশের গর্ব ও শক্তি’
সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশিদের দেশের গর্ব ও শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, তাঁদের কঠোর পরিশ্রম একদিকে যেমন পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতও শক্তিশালী করছে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে প্রায় ৪৭৫ দশমিক ০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অবলম্বন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রবাসীদের প্রতি পাঁচ অনুরোধ
সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রতি পাঁচটি বিশেষ অনুরোধ জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি তাঁদের হুন্ডি পরিহার করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে বলেন।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের আইন, বিধি-বিধান ও কর্মসংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল থাকা এবং উগ্রবাদ ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ভিন্ন ভাষা ও ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং নতুন প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান ও ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের আরও দক্ষ করে তোলারও পরামর্শ দেন তিনি।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে বেতন-বকেয়া ও কর্মসংস্থান হারানো বাংলাদেশি কর্মীদের সহায়তায় সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ারের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান শামা ওবায়েদ।
প্রবাসীদের বিনিয়োগের আহ্বান
দেশে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ সুবিধাসম্পন্ন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা উল্লেখ করে প্রবাসীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁদের বিনিয়োগ দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরে কর্মরত ১৫ জন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। এ ছাড়া চারটি প্রতিষ্ঠান, দুইজন সিআইপি এবং সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আওতাধীন শীর্ষ তিনটি এক্সচেঞ্জ হাউজকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সম্মাননাপ্রাপ্তদের হাতে স্মারক তুলে দেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!