চট্টগ্রাম সফরে এসে তোরণ-ব্যানারের জাঁকজমক এড়িয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিশে আলোচনায় এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাঁশখালীতে তাঁর সফর ঘিরে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকটি তোরণ নির্মাণ করলেও সফরের আগের রাতে পুলিশ সেগুলো খুলে দেয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় তোরণ-ব্যানার না লাগানো এবং এ ধরনের কাজে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
রোববার চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে ঘরের চাবি ও সহায়তার অর্থ তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। তাঁর এ ধরনের আচরণ স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
ঘরের চাবি দিয়ে থামেননি
বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্র উপকূলসংলগ্ন পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বন্যায় গৃহহারা ১০০ পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চাবি হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। ঘরগুলো কেমন হয়েছে এবং যাঁদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, তা সরেজমিনে দেখেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এক বিধবা নারীকে দেওয়া নতুন ঘরেও যান তিনি। ঘরটি ঘুরে দেখার পাশাপাশি ওই নারী ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই নারীর স্বামী দুই বছর আগে মারা গেছেন। তাঁদের চার মেয়ে ও দুই ছেলে।
পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়ার পর ওই বাড়ির আঙিনায় একটি গাছও লাগান প্রধানমন্ত্রী।
নতুন ঘর পাওয়া ওই নারী বলেন, সরকার ঘর করে দিয়েছে—এটি তিনি জানতেন। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে তাঁর ঘরে এসে কথা বলবেন, তা তিনি ভাবেননি। তাঁর কাছে পুরো ঘটনাটি স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে।
সকাল থেকেই মানুষের ভিড়
বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রীর পৌঁছানোর কথা ছিল দুপুর সাড়ে ১২টায়। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকা মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়।
উপকূলীয় বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে অনেকে হেঁটে এবং অন্যান্য এলাকা থেকে যানবাহনে করে পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আসেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে দলীয় উদ্যোগে প্রায় ৮০টি বাসে করে নেতাকর্মীরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
তীব্র গরম উপেক্ষা করে অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর আসার সময় সড়কের দুই পাশে মানুষের ভিড় তৈরি হয়। কেউ কেউ কাছ থেকে তাঁকে দেখার আশায় ঘরের চালা ও গাছের ওপরও উঠে পড়েন।
ফটিকছড়িতে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়
বাঁশখালীর অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী যান ফটিকছড়িতে। সেখানে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সকাল থেকেই ফটিকছড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ফটিকছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে এবং পেলাগাজী দিঘির সিএন্ডবি মাঠ ও আশপাশের এলাকায় হাজারো মানুষ জড়ো হন।
মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
হাটহাজারীতেও সাধারণ মানুষের কাছে
ফটিকছড়ি থেকে হাটহাজারীতে গিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি নির্মাণে সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ সহায়তার অর্থ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
সেখানেও তিনি সুবিধাভোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাদাভাবে কুশল বিনিময় করেন।
চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অসাধারণ গুণ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসা থেকে হাটহাজারী ও চট্টগ্রাম নগরীর কর্মসূচি পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন বলে জানান।
নগরীতে সাংগঠনিক সভায় ‘ঐক্যের’ বার্তা
সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লুর সম্মেলন কক্ষে মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করেন প্রধানমন্ত্রী।
রাত সোয়া ৮টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার এই সভায় দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা দেন তিনি।
সভায় উপস্থিত নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান নেতাকর্মীদের পারস্পরিক দূরত্ব ও বিভাজন এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেন। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে বিএনপির মূল কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
নেতাকর্মীদের পরস্পরকে ‘একই পরিবারের সদস্য’ হিসেবে বিবেচনা করে পাশে থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সরকারের কর্মকাণ্ডকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে দেখার পাশাপাশি সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
গুজব এড়িয়ে সঠিক তথ্য দেওয়ার আহ্বান
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়েও নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন তারেক রহমান।
তথ্য যাচাই না করে কোনো গুজব বিশ্বাস বা প্রচার না করার জন্য নেতাদের পরামর্শ দেন তিনি। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সভায় অংশ নেওয়া এক নেতা বলেন, দলের চেয়ারম্যানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল ঐক্য। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নেতাকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
চট্টগ্রামে সরকার গঠনের পর বিএনপির চেয়ারম্যানের এটি ছিল স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে প্রথম সাংগঠনিক সভা। দিনভর তাঁর বিভিন্ন কর্মসূচি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!