বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহার, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সঞ্চালন অবকাঠামোর অভাবে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উইন্ডি টাউন হলে ‘নেভিগেটিং ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজি ফর অ্যাচিভিং এসডিজিস’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনের একটি অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। সম্মেলনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
ভোলার গ্যাস কন্টেইনারে সরবরাহের উদ্যোগ
গ্যাসের উৎপাদন কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে বলে জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ। এতে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাস কন্টেইনারে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকায় আনতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ওই বিনিয়োগের বিপরীতে গ্যাসের মজুত থেকে পর্যাপ্ত রিটার্ন পাওয়া যাবে কি না, তা বিবেচনা করে কন্টেইনারে গ্যাস পরিবহনের বিকল্প ভাবা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০টি কন্টেইনারের মাধ্যমে আটটি শিল্পে ভোলার গ্যাস সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকেও কন্টেইনারে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে কাস্টম-মেড কন্টেইনার তৈরি ও সরবরাহে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ
বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিকে বিনিয়োগবান্ধব করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে হোল্ডিং ট্যাক্সে রিবেট দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা কাটাতে বড় আকারের ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ।
প্রিপেইড মিটার ব্যবহারে গুরুত্ব
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, এতে গ্রাহক যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, ততটুকুর বিলই পরিশোধ করবেন। একই সঙ্গে মিটার রিডিং ও বিল সমন্বয়ে অনিয়ম কমবে।
তিনি গ্রাহকদের বিদ্যুতের অপচয় রোধের আহ্বান জানান।
ভবিষ্যতে কোনো ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকার জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে কাউকে না কাউকে দাঁড়িয়ে বলতে হবে—নো।’
এসডিজি অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এসডিজি অর্জনে নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পরিবেশগত স্থায়িত্বকে শুধু সরকারি ব্যয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন শহর, দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই পরিবহন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, জীবিকা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে উল্লেখ করে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে পরিবহন ও যানবাহনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ, শিল্পে ক্লিনার প্রোডাকশন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ ও সড়কের ধুলা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ এবং নগর পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত।
তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গ্রিন ফাইন্যান্স, ক্লাইমেট ফাইন্যান্স, বেসরকারি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য ও অসংখ্য টার্গেট একইভাবে পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। কোন সূচকে দেশ পিছিয়ে আছে এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে কোথায় বেশি ফল পাওয়া সম্ভব, তা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।
এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, স্থানীয় সরকার ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!