সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আধুনিক পর্যটন নগরী গড়ে উঠেছে। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরো, যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি ও পানামা সিটি, স্পেনের বার্সেলোনা, দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান, সিঙ্গাপুর ও দুবাই এর উদাহরণ। এসব শহরের আদলে কক্সবাজারকে এশিয়ার অন্যতম আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
এ লক্ষ্যে কক্সবাজারের জন্য নতুন করে ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কক্সডিএ) সৈকতসহ বিভিন্ন এলাকায় মাটি পরীক্ষা করেছে। তবে পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।
সরকারের দুই মন্ত্রী এরই মধ্যে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো।
নতুন মাস্টারপ্ল্যান
গত ২৩ জুলাই সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে।
উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
বর্তমানে কক্সবাজারের ভূ-প্রকৃতি, বন, পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এলাকাভেদে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে সুউচ্চ ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০১১ থেকে ২০৩১ মেয়াদের প্রথম মাস্টারপ্ল্যানে এসব বিধিনিষেধ রাখা হয়েছিল।
২০১৬ সালে কক্সডিএ প্রতিষ্ঠার পরও পুরোনো মাস্টারপ্ল্যানের শর্ত অনুসরণ করে নগর উন্নয়নের কাজ চলছিল। তবে পুরোনো পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা ও পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে নতুন করে ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবুল বাকের মো. তৌহিদ বলেন, নতুন মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শেষ করতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগবে।
কক্সডিএর উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ মো. তানভীর হাসান রেজাউল বলেন, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। সৈকতসহ বিভিন্ন এলাকা জোনিং করে এবার মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও বিজ্ঞানসম্মতভাবে করা সম্ভব হবে।
হাইরাইজ ভবন নির্মাণে মাটির পরীক্ষা
গবেষণা অনুযায়ী, কক্সবাজার ও কুয়াকাটা অঞ্চলে বালু, পলি ও নরম সামুদ্রিক মাটির আধিক্য রয়েছে। ফলে ৩০ তলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শক্ত ভারবহনক্ষম স্তর বা শিলা পর্যন্ত গভীর পাইল ফাউন্ডেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নির্মাণব্যয়ও বেশি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ খান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি মাটির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই মাটি পরীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। সুউচ্চ ভবন নির্মাণের উপযোগিতা পাওয়া গেলেও উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
১৯৯৯ সালে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। এসব এলাকায় ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন, দূষণকারী শিল্প স্থাপন, আবাসস্থল ধ্বংস, বন ও গাছপালা কাটা এবং বন্যপ্রাণী শিকারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।
তবে বিদ্যমান বিধিনিষেধের মধ্যেই কক্সবাজারে বিভিন্ন সময়ে হোটেলসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা অপসারণে কক্সডিএ উদ্যোগ নিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সীমিত ভূমির দেশে পরিকল্পিত বহুতল উন্নয়ন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর সমন্বয়ে কক্সবাজারে আধুনিক পর্যটন নগরী গড়ে তোলা হবে।
২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে কক্সবাজারকে দেশের অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারকে পর্যটন ও বাণিজ্যিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!