ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকাংশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও এনবিআর যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
আস্থা ফেরাতে হবে এনবিআরের ওপর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ এখন এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে করদাতারা চান, প্রতিষ্ঠানটি তাদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক।
দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন সম্ভব উল্লেখ করে রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, করদাতাদের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব তাঁদের নিতে হবে। সরকার এনবিআর তথা দেশের রাজস্ব কাঠামোকে আরও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের প্রভাব থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো এনবিআরও মুক্ত থাকতে পারেনি। নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে এখন আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’
শুধু বেশি কর আদায় নয়
আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি রাজস্ব আদায় নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, আরও বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করাই আধুনিক কর ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, করদাতাদের সম্মানের সঙ্গে সেবা দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেন, তাঁদেরও যথাযথ প্রক্রিয়ায় কর প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে।
কর ব্যবস্থাপনা ও কর আদায়ের পদ্ধতি সহজ, হয়রানিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ যেন স্বেচ্ছায় ও স্বাচ্ছন্দ্যে কর দিতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর নীতি টেকসই নয়। বরং কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের করের আওতায় আনতে হবে।
এ জন্য আধুনিক, ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ
বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসার ধরনও বদলে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে আন্তর্জাতিক কর ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন তিনি। ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্যিক আর্থিক অপরাধ, মানি লন্ডারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক। তাই সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে করদাতার পরিধি বাড়াতে হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার আহ্বান
ভ্যাটকে আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এর সফলতা নির্ভর করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের ওপর।
ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা আয়কর আদায় শুধু জোর করে আদায়ের বিষয় নয়। রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়। তাই এনবিআরকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যাকে মানুষ ভয় নয়, বরং বিশ্বাস করবে।
‘সবার আগে দেশের স্বার্থ’
রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। প্রত্যেক মানুষের অবদানকে সম্মানের সঙ্গে দেখতে চায় সরকার। সমস্যা থাকবে, তবে আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেগুলোর সমাধান করা হবে।
সরকারের কর্মকর্তাদের নিরাপদ ও স্বস্তির সঙ্গে দেশ গঠনে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সরকার অগ্রাধিকার দেবে।
রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক অগ্রগতি
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ইতিবাচক ছিল বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এটিকে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এটি প্রমাণ করে আপনারা পারবেন। অবশ্যই পারবেন, ইনশাল্লাহ।’
দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে রাজস্ব আদায় নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান শেষে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে এনবিআরের বিভিন্ন স্টলে প্রদর্শিত ডিজিটাল উপস্থাপনা ঘুরে দেখেন তিনি।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!