জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সারা দেশের গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে গ্রামীণ সড়ক, স্বাস্থ্য, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে।
বুধবার পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
গ্রামীণ সড়কে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলা ও সব উপজেলায় ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ৭ হাজার মিটার সেতু ও কালভার্ট পুনর্বাসন করা হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়কের অবস্থা মূল্যায়ন করে যেসব অঞ্চলের মানুষ যাতায়াতে বেশি সমস্যায় পড়ছেন, সেসব সড়ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি মূলত সংস্কার ও পুনর্বাসনের কাজ। তবে সড়ক সংস্কারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
গ্রামীণ সড়ককে টেকসই করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রথম বছরে ১০০ কিলোমিটার সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে রাবার-বিটুমেন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এর ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
ঢাকা মেডিকেলের ভবন পুনর্নির্মাণে ১১৫৫ কোটি
স্বাস্থ্য খাতে দুটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণে ব্যয় হবে ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। দেশের প্রাচীনতম এই চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরোনো ভবন, ছাত্রাবাস ও অন্যান্য আবাসিক-অনাবাসিক স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া ১০টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ১৯টি হোস্টেল নির্মাণের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
সেতু রক্ষণাবেক্ষণে স্মার্ট প্রযুক্তি
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে ‘বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন সেতুর স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (কোইকা) সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রাথমিকভাবে চারটি সেতুর অবস্থা পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে সেতুর কাঠামোগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নদীভাঙন ও উপকূলীয় বাঁধে বরাদ্দ
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে লালমনিরহাট সদর উপজেলা রক্ষায় ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করতে ব্যয় হবে ৫৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদারসংক্রান্ত তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। সংশোধনের ফলে প্রকল্পটির ব্যয় ৪৫ লাখ টাকা কমেছে।
সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো
একনেকে বিদ্যুৎ খাতের দুটি প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকায় ডেসকোর এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদে ১০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রামু সেনানিবাসে ১ হাজার ৩১১ কোটি টাকার প্রকল্প
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।
সাকি বলেন, বর্তমানে রামু সেনানিবাসে ৮ হাজারের বেশি সেনাসদস্যের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নেই। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাহাড় কেটে সমতল না করে বিদ্যমান ভূপ্রকৃতি অক্ষুণ্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জমির স্বাভাবিক উচ্চতা বিবেচনায় নিয়ে ভবনের নকশা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পে পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ক্লাস্টার পদ্ধতি
একনেক সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও নয়টি প্রকল্পের বিষয়েও অবহিত করা হয়। এসব প্রকল্প এরই মধ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন করেছেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, একই ধরনের প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পরিকল্পনা কমিশন বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। গত ১৮০ দিনে সরকার বিচ্ছিন্ন প্রকল্পনির্ভর পদ্ধতি থেকে সরে এসে কর্মসূচিভিত্তিক ক্লাস্টার পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
এ পদ্ধতিতে একই ধরনের প্রকল্পগুলোকে একটি অভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এতে প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি শনাক্ত করার পাশাপাশি কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটিও চিহ্নিত করা যাবে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন ইতিমধ্যে ৪১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করেছে বলে জানান সাকি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় কমানোর উদ্যোগ
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয়সীমা কমিয়ে আনতেও সরকার কাজ করছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোনো কোনো প্রকল্পের ধারণাপত্র তৈরি থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন, অনুমোদন ও কার্যাদেশ জারি পর্যন্ত দেড় থেকে চার বছর সময় লেগে যায়। এ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে একটি সংশোধিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকেও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারি উদ্যোগের প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০৩১ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা
২০৩১ সাল পর্যন্ত দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামোর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে ভঙ্গুরতা থেকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া।
প্রথম দুই বছর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, পরবর্তী তিন বছর উত্তরণ এবং পুরো পাঁচ বছর পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জরুরি জ্বালানি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একনেক সভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!