জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সুরক্ষায় সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে সুরক্ষায় ইউপিআর-৪ সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক জাতীয় অ্যাডভোকেসি সেমিনারে এ আহ্বান জানানো হয়। সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার (এসিএফ) এবং ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।
সেমিনারে বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা বা ইউপিআর পর্বে জলবায়ু-সম্পর্কিত সরকার সমর্থিত সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মানুষের অধিকার সুরক্ষায় কী ধরনের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, তা নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী ও ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক মো. শামসুদ্দোহা জানান, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় ইউপিআর চক্রে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা ও প্রশমন বিষয়ে সরকার দুটি সুপারিশ সমর্থন করেছিল।
এরপর ২০২৩ সালে চতুর্থ ইউপিআর চক্রে সিপিআরডির নেতৃত্বে ১৫টি নাগরিক সংগঠনের একটি জোট যৌথ প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে সাতটি ক্ষেত্রে কৌশলগত পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়। পরে ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য সরকার ১২টি সুপারিশ গ্রহণ করে।
শামসুদ্দোহা বলেন, এসব অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা নীতি, কর্মসূচি ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নিয়েছে, তা নিয়মিত অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাস্তবায়নের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার পথও নির্ধারণ করতে হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নূরুন নাহার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী এর প্রভাব বেশি অনুভব করছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন মোকাবিলায় এখনো যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি উদ্বেগের বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার—রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি শেখ নূর আতায়া রাব্বি। তিনি তৃতীয় ইউপিআর চক্রের পর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ এবং চতুর্থ ইউপিআর চক্রে নাগরিক সমাজের দেওয়া সুপারিশের বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলে ধরেন।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পিকেএসএফের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ। তাঁর মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, এমবিই, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকারকর্মী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উদ্বেগ রয়েছে। তবে মানুষের অধিকার কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সেমিনারে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন ঘাটতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনা হয়। এতে নীতিনির্ধারক, মানবাধিকারকর্মী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য নাগরিক সমাজের একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথাও জানানো হয়।
No comments yet. Be the first to comment!