স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে দেশে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত গুম ও নির্যাতনবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ও সক্ষমতা নাজুক অবস্থায় ছিল। গত ছয় মাসে তাদের নৈতিকতা, মনোবল ও কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনিও গুমের শিকার হয়েছিলেন। তাই দেশে একটি শক্তিশালী গুম প্রতিরোধ আইন প্রতিষ্ঠা করা তাঁর প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, ‘আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আবার আমিও গুমের শিকার। আমি কি চাইব না বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী গুম প্রতিরোধ আইন হোক?’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারে কে থাকবে বা ভবিষ্যতে কে থাকবে না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আইনটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকবে। গুমের শিকার যে ব্যক্তিই হোন, তাঁর বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
র্যাবের নাম বিলুপ্তির উদ্যোগ
র্যাবের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করার জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ-সংক্রান্ত আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা প্রকাশ করা হবে।
তবে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধ দমনে গোয়েন্দা সহায়তা, সাইবার গোয়েন্দা কার্যক্রম ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মানবাধিকার কমিশন আইন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়েও সরকার আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আইন প্রণয়নের চেষ্টা করছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, আইনজীবী ও কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আইন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে।
মিরাজ শেখের অন্তর্ধান প্রসঙ্গে যা বললেন
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত অন্তর্ধান প্রসঙ্গেও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’ পরিচালনার ফলে জলদস্যু ও বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এ কারণে কোস্টগার্ডের একটি কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় মামলা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তে কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন
অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর গুম হওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁকে অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে প্রায় ৫ ফুট বাই ১০ ফুট একটি কক্ষে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন ছিল না এবং তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। পরে চোখ বেঁধে তাঁকে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় তাঁকে দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর আইনি লড়াই করতে হয়। পরে ভারতীয় আদালত তাঁকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। এমন একটি আইন করা প্রয়োজন, যাতে গুমের শিকার ব্যক্তিরা দ্রুত ও যথাযথ বিচার পান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতনের ওপর আয়োজিত সাত দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। প্রদর্শনীটি ২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান), জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম ও নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসানসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!