জাতীয়

গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যত ক্ষমতাবানই হোক, বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি

আপডেট: আগ ৩১, ২০২৬ : ০৫:৪০ এএম ১৬
গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যত ক্ষমতাবানই হোক, বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি

গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গুমের ঘটনায় জড়িতদের আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে।

রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের—তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন—বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে।’

তিনি বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্রকে আন্তরিকভাবে দাঁড়াতে হবে।

‘আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না’—বলেন রাষ্ট্রপতি।

‘গুম-খুনের সংস্কৃতি ছিল বেদনাদায়ক অধ্যায়’

বিগত দেড় দশকে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাদের স্তব্ধ করে দিতে তুলে নেওয়া, গুম ও খুন করা হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অপরাধ অস্বীকার করেছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

গুমকে ‘জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুম শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না; এর সঙ্গে প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বস্তিও হারিয়ে যায়।

গুমের শিকারদের পরিবারকে পুনর্বাসনের আহ্বান

রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম ও খুনের মাধ্যমে এসব অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি এ সময় গুমের শিকার ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম, সালাহউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার আরমান ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা স্মরণ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথাও স্মরণ করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, খালেদা জিয়া গুম-খুনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসব ঘটনার বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না।’

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক—এবং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করেন—তার ওপরই রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্য নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তেই সবাইকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

অনুষ্ঠানে গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা সানজিদা ইসলাম তুলির কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষের অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। তারা গুমের ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!