রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো অপরাধীকে সুরক্ষা বা অনুকম্পা দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউস মিলনায়তনে সিলেটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সিলেট জেলা প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অপরাধী কেবলই অপরাধী। রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি প্রশাসনকে সিলেটের স্থানীয় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও চোরাচালানিদের একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং দলীয় পরিচয়ের কারণে কোনো প্রকৃত অপরাধী যেন পার না পেয়ে যায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে এ নির্দেশনার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট’ নীতি চালু করা হয়েছে জানিয়ে তিনি সিলেট রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মহানগর পুলিশে (এসএমপি) এ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
আন্দোলনের মামলাগুলো পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারের পরিবর্তে তৃতীয় পক্ষ মামলা করেছে। এসব মামলা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি বা অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের চর্চার কারণে আন্দোলনের প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে সতর্ক করেন তিনি।
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিহতের পরিবার মামলা করার সুযোগই পায়নি। অথচ অন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তি প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত অপরাধীদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।
সিলেট রেঞ্জ ও মহানগর এলাকার সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী অহেতুক হয়রানির শিকার ও নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামির তালিকা থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।
মামলা পুনর্নিরীক্ষার সময় কোনো ধরনের তদবির, আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী ও হুকুমদাতারা যেন কোনোভাবেই রেহাই না পায়, সে নির্দেশও দেন তিনি।
‘মব’ সংস্কৃতি সহ্য করা হবে না
‘মব’ বা অরাজকতা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দাবি আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ বা ঘেরাও না করে প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে হবে। স্মারকলিপি দেওয়া বা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমেও দাবি জানানো যেতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মবের ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। সিলেট অঞ্চলকেও সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মাদক কারবারিদের তালিকা চাইলেন বাণিজ্যমন্ত্রী
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সাধারণ মাদকসেবীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ অন্তত ৫০ জন মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করতে হবে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ভৌগোলিক আয়তনে সবচেয়ে বড় মহানগর পুলিশ এলাকা হিসেবে এসএমপির লজিস্টিক সংকট দূর করতে হবে। পাশাপাশি নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত পুলিশি যানবাহন সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বালু-পাথর কোয়ারি ও সীমান্ত পরিস্থিতি
সিলেটে বালু ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে প্রস্তুত করা কার্যবিবরণী অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আদালতে চলমান মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে তদারকি জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
সভায় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বক্তব্য দেন।
এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা সঞ্চালনা করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকী সাহা।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ দমনে পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার এবং অপরাধীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!