গণপরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও নগর চলাচলব্যবস্থা উন্নত করতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আরও মেট্রোরেল নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বড় শহরেও পর্যায়ক্রমে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
আজ বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। এ সময় পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন।
সাকি বলেন, দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে আধুনিক গণপরিবহনের চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এখন এ খাতে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মেট্রোরেল নির্মাণ করেছি, ট্রেন চলছে এবং মানুষ এর সুফল ভোগ করছে। এখন মেট্রোরেল নির্মাণের বিভিন্ন কাজে অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের নিজেদের তৈরি করতে হবে।’
ভবিষ্যৎ প্রকল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিদেশি কারিগরি দক্ষতার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
মেট্রোরেল-৫-এর ব্যয় নিয়ে যা বললেন
মেট্রোরেল-৫-এর সাউদার্ন রুটের ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ার বিষয়ে সাকি বলেন, প্রকল্পের আওতা, ভূগর্ভস্থ নির্মাণ, বিস্তারিত নকশা, অর্থায়নের শর্ত, বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও করসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্প ব্যয়ে পার্থক্য হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় প্রস্তাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। তবে পরিকল্পনা কমিশন পর্যালোচনা করে একনেকে উপস্থাপনের আগে ব্যয় কমিয়েছে। পাশাপাশি একটি কারিগরি কমিটিও প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়নের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছে।
প্রকল্পটির জন্য উচ্চ ব্যয়ে কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। প্রকল্প অনুমোদনের পর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর দরপত্রের নথি প্রস্তুত করে ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে।
জাইকার ঋণের সুদ বেড়েছে
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সাকি বলেন, জাপানের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় অর্থায়নের শর্তে পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, আগে সুদের হার প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বিবেচনা করা হলেও তা বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনে আরও বিলম্ব হলে সুদের হার আবারও পরিবর্তন হতে পারে। জাতীয় স্বার্থে সরকার যতটা সম্ভব দর-কষাকষি করেছে।
প্রকল্প ব্যয় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব
চলমান কিছু মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অনেক সময় প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। পরে বিস্তারিত নকশার সময় কাজের পরিধি ও অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তা যুক্ত হলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
ভূগর্ভস্থ স্টেশন আরও গভীরে নির্মাণ, অতিরিক্ত অবকাঠামো ও কাজের পরিধি পরিবর্তনও ব্যয় বাড়ার কারণ হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে প্রকল্প প্রস্তুত প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সাকি বলেন, প্রকল্প প্রস্তুতির পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন ঘাটতিগুলো বন্ধ করতে হবে। বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা ও ব্যয় প্রাক্কলনের যাচাই আরও জোরদার করতে প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত নির্দেশিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা থাকা সরকারি সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট কাজ করার সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এতে আলাদা করে পরামর্শক খাতে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন কমবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে জোর
বিদ্যমান মেট্রোরেল অবকাঠামোর মান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে সাকি বলেন, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যা পরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি বা দুর্নীতির কারণে কোনো দুর্বলতা তৈরি হয়ে থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
ভবিষ্যতের মেট্রোরেল চুক্তিতে নির্মাণের মান, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। ভূগর্ভস্থ অংশের টানেলের ওপরের স্থাপনায় কোনো ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে তা মেরামত ও প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা চুক্তিতে রাখার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়া সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে যেখানে সম্ভব, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান সাকি।
তিনি বলেন, সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করাই সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য। এর মধ্যে উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা, ভ্রমণ সময় কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা অন্যতম।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!