সকালের রোদ একটু চড়া হতেই গ্রামের সড়কের দুই পাশে ছড়িয়ে পড়ছে সোনালি রং। কোথাও পানিতে জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন কৃষকেরা, কোথাও সড়কের ওপর মেলে দেওয়া হয়েছে সদ্য ধোয়া পাট।
পাশে বড় বড় আঁটি করে রাখা হয়েছে পাটকাঠি। কেউ রোদে শুকানোর জন্য আঁশ উল্টে দিচ্ছেন, কেউ আবার শুকনো পাটের আঁটি বাঁধছেন। সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন এমনই ব্যস্ততা। পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে সময় পার করছেন কৃষকেরা। চলতি মৌসুমে রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে পাটের দামও সন্তোষজনক থাকায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।
পাট কাটার পর ১৫ থেকে ২০ দিন পানিতে জাগ দিয়ে রাখলে আঁশ ছাড়ানোর উপযোগী হয়। জেলার বেশির ভাগ এলাকায় এখন চলছে পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ। কোথাও কোমরসমান পানিতে নেমে কৃষকেরা পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন, আবার কোথাও ভ্যানগাড়িতে পাটের বোঝা নিয়ে বাজারের দিকে যেতে দেখা যাচ্ছে তাঁদের।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কের ধুলিহর এলাকায় পাটের আঁটি বাঁধছিলেন কৃষক মাজেদ আলী। তিনি বলেন, ১৯ দিন পানিতে জাগ দিয়ে রাখার পর তিন-চার দিন আগে পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়েছেন। এখন আঁটি বেঁধে শুকাচ্ছেন। ধান কাটার পর জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১১ হাজার ৬০৭ হেক্টর জমিতে। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ৬৮ হেক্টর।
চলতি মৌসুমে এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বেলে প্রায় ১৮২ কেজি পাট থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। এখনো কয়েকটি এলাকায় পাট কাটা চলছে। কৃষকেরা প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ মণ ফলনের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পাটের পাতা মাটির উর্বরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পাটের আঁশ ও পাটকাঠিও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে জেলায় পাটভিত্তিক কোনো শিল্প না থাকায় উৎপাদিত পাট স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরেও বিক্রি হয়।
সোমবার সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাধবকাঠি এলাকায় সড়কের ওপর পাটের আঁশ শুকাতে দেখা যায় এক নারীকে। প্রায় ২০ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকাচ্ছিলেন তিনি।
একই সড়কের পাশে বিলের পানিতে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন তিন কৃষক। তাঁদের একজন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ১১ শতক জমিতে পাট চাষ করতে বাজার থেকে ৩০০ গ্রাম বীজ কিনে বুনেছিলেন। প্রায় দুই মণ পাট হয়েছে। পাশাপাশি পাটকাঠিও পেয়েছেন। প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন।
সদর, তালা, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটখেতে রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম ছিল। সাধারণত পাটে গোড়া পচা, পাতা শুকিয়ে যাওয়া ও বিছা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এবার এসব রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে বলে জানান কৃষকেরা।
কলারোয়া উপজেলার ঝাপাঘাট গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, পাঁচ কাঠা জমিতে পাট চাষ করেছেন। ৩৪ আঁটি পাটকাঠি হয়েছে। পাট হবে আড়াই থেকে তিন মণ। চাষ ও পাট ধোয়া বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে এবার লাভ থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, গত বছর পাটে রোগবালাই বেশি ছিল। বারবার কীটনাশক দিতে হয়েছে। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় রোগবালাই কম হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে পাটের দামও ভালো।
কলারোয়ার হেলাতলা এলাকার কৃষক করিম হোসেন বলেন, প্রতিবছর তিনি দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেন। গত বছর ২৫ মণ পাট পেয়েছিলেন। এবার ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৩০ মণ পাট পাওয়ার আশা করছেন।
পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর তা রোদে শুকানোর পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাটকাঠি সংরক্ষণ করছেন কৃষকেরা। কোথাও বাড়ির আঙিনায়, কোথাও সড়কের পাশে বড় বড় আঁটি করে রাখা হয়েছে পাটকাঠি।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দামে মোটামুটি সন্তুষ্ট কৃষকেরা। গত বছরও পাটের দাম কাছাকাছি ছিল। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং শেষ দিকে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ্ মোহামাদ আবদুল্লাহ বলেন, পাটকেলঘাটা এলাকায় পাটের বড় বাজার রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছেন। এখন কৃষকেরা বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারদর জানতে পারেন।
ভালো ফলন, তুলনামূলক কম রোগবালাই এবং সন্তোষজনক বাজারদর—সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে পাট চাষে স্বস্তিতে সাতক্ষীরার কৃষকেরা। মাঠ থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো পর্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেই এখন সোনালি ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় তাঁরা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!