জাতীয়

নদীর বুকে গতির লড়াই, ফিরে আসছে বাংলার নৌকাবাইচ

আপডেট: অক্টো ০৪, ২০২৬ : ০৫:০৯ এএম ৪ ০
নদীর বুকে গতির লড়াই, ফিরে আসছে বাংলার নৌকাবাইচ

শরতের নীল আকাশ। বর্ষার পানি তখনো নদী-নালা, খাল-বিল ও হাওরে টইটম্বুর। নদীর বুকে সারি সারি নৌকা, শত শত বৈঠার ছন্দ আর তীরে অপেক্ষমাণ মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্য রকম এক উৎসবের আবহ। বাংলার সেই চিরচেনা লোকজ আয়োজন নৌকাবাইচ।

আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়েও নদীর বুকে গতির এই লড়াইয়ের আবেদন কমেনি। বরং দীর্ঘ বিরতির পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও আয়োজন করা হচ্ছে নৌকাবাইচ। কোথাও দুই বছর, কোথাও ১৭ বছর পর ফিরে এসেছে এই ঐতিহ্যবাহী জল-উৎসব।

সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরগঞ্জের ঘোড়াউত্রা, ঢাকার বুড়িগঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, ফরিদপুরের কুমার, কুষ্টিয়ার গড়াই ও মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচকে ঘিরে জমেছে মানুষের ঢল।

হাজার বছরের লোকঐতিহ্য

নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকাবাইচের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্ষায় নদী-নালা, হাওর-বিল পানিতে ভরে উঠলে বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় এই প্রতিযোগিতা।

নৌকাবাইচের উৎপত্তি নিয়ে নানা লোককথা প্রচলিত আছে। কারও মতে, ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে এর সূচনা। আবার কারও মতে, নবাব ও জমিদারদের আমলে নৌযুদ্ধের মহড়া থেকেই এর প্রচলন। তবে ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা যাই হোক, সময়ের সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষের অন্যতম জনপ্রিয় লোকউৎসবে।

নৌকাবাইচ এখন শুধু প্রতিযোগিতা নয়; এটি গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলা, আনন্দ ও সম্প্রীতিরও উপলক্ষ।

যে নৌকায় চলে প্রতিযোগিতা

নৌকাবাইচে সাধারণ নৌকা ব্যবহার করা হয় না। অঞ্চলভেদে ছিপ, কোষা, খেলনা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, ঘাসি, বাচারি ও পানসিসহ নানা ধরনের নৌকা ব্যবহার করা হয়।

কোনো কোনো নৌকা ১০০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। কাঠের তৈরি এসব নৌকা রঙিন নকশা ও কারুকাজে সাজানো হয়। কোনো নৌকার গলুইয়ে ময়ূরের মুখ, কোনোটি আবার সিংহের অবয়ব দিয়ে সাজানো হয়।

একেকটি নৌকায় ৫০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাঝি থাকতে পারেন। তাঁদের পোশাকেও থাকে একধরনের সামঞ্জস্য। মাথায় রঙিন গামছা, হাতে বৈঠা—দলনেতার নির্দেশে সবাই একই ছন্দে বৈঠা চালান।

নৌকার মাঝখানে থাকা দলনেতা বা কাণ্ডারি সারিগানের তালে মাঝিদের উৎসাহ দেন। ‘হেইও রে হেইও’ ধ্বনির সঙ্গে একযোগে পানিতে পড়ে শত বৈঠা। মুহূর্তেই নদীর বুক পরিণত হয় গতির মঞ্চে।

তীরে নামে মানুষের ঢল

নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই তীরে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। কোথাও সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় লাখের ঘর। তীরে জায়গা না পেয়ে অনেকে ছোট নৌকা, ট্রলার কিংবা নৌযানে করে নদীর মাঝখানে অবস্থান নেন।

ঢাক-ঢোল, কাঁসর-করতাল আর দর্শকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। প্রতিযোগী নৌকাগুলো যখন দ্রুতগতিতে ফিনিশিং লাইনের দিকে ছুটে যায়, তখন দর্শকদের উচ্ছ্বাসে তৈরি হয় উৎসবের অনন্য পরিবেশ।

অঞ্চলভেদে আলাদা রূপ

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকাবাইচের ধরন ও নৌকার নামেও রয়েছে বৈচিত্র্য।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে নৌকাবাইচের জনপ্রিয়তা অনেক। টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকির বিশাল জলরাশিতে খেলনা ও সারঙ্গী ধরনের নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। সারিগানের তালে একসঙ্গে শত বৈঠা পড়ার দৃশ্য সেখানে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।

পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরের চলনবিল অঞ্চলে ছিপ ও কোষা নৌকার ব্যবহার বেশি। সরু ও দ্রুতগতির ছিপ নৌকা পানির ওপর দিয়ে ছুটে চলে তীরের বেগে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর নৌকাবাইচেরও রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। গত ১২ সেপ্টেম্বর দুই বছর পর সেখানে আবার নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। ময়ূরপঙ্খী ও ছিপ নৌকার পাশাপাশি নৌকার গলুইয়ের কারুকাজও দর্শকদের আকর্ষণ করে।

ফরিদপুরের কুমার নদে গত ১৮ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ বিরতির পর নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে আয়োজিত ওই প্রতিযোগিতায় কোষা ও বাচারি নৌকার অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

কিশোরগঞ্জের নিকলীর ঘোড়াউত্রা নদীতেও দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর নৌকাবাইচ হয়। চার কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রতিযোগিতায় বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের অন্তত ১২টি নৌকা অংশ নেয়।

ঢাকার নদীতেও ঐতিহ্যের ফিরে আসা

নৌকাবাইচের আয়োজন এখন শুধু গ্রাম বা হাওরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকার বুড়িগঙ্গাতেও এ বছর বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ হয়েছে।

ঢাকার ৪১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২১ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বুড়িগঙ্গায় নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। খোলামোড়া ঘাট থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ওই প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড় জমে।

একই আয়োজনের অংশ হিসেবে আহসান মঞ্জিলের কাছের নবাববাড়ির ঐতিহাসিক গোল তালাবেও ৩২ বছর পর প্রতীকী নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়।

পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম মানিকগঞ্জে

গত ৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জের বেউথা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচেও ছিল ব্যাপক আয়োজন। শতবর্ষী এই লোকঐতিহ্য দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ।

প্রতিযোগিতায় খেল্লা, ঘাসি, ছান্দি ও পানসি—এই চার বিভাগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ২২টি নৌকা অংশ নেয়।

খেল্লা বিভাগে কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে আসা ‘মায়ের দোয়া’ নৌকা চ্যাম্পিয়ন হয়। ঘাসি বিভাগে সিংগাইরের ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’, ছান্দিতে হরিরামপুরের ‘গায়ান বাড়ি’ এবং পানসি বিভাগে মানিকগঞ্জ সদরের ‘জাগীর জনতা এক্সপ্রেস’ প্রথম স্থান অর্জন করে।

বাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে বসে লোকজ মেলা। ছিল নাগরদোলাসহ নানা আয়োজন।

আধুনিকতার ভিড়েও অমলিন

মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারের এই সময়ে অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নৌকাবাইচ এখনো মানুষের আকর্ষণ ধরে রেখেছে। এর বড় কারণ, এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়—এটি একসঙ্গে বহু মানুষকে আনন্দ ও উৎসবে যুক্ত করে।

নৌকাবাইচে ধর্ম-বর্ণ কিংবা শ্রেণির ভেদাভেদ থাকে না। নদীর দুই পাড়ে একই সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষ। ফলে এটি গ্রামীণ সমাজে সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও একটি মাধ্যম।

দেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ বিরতির পর নৌকাবাইচের আয়োজন নতুন করে শুরু হওয়া তাই কেবল একটি খেলাধুলার আয়োজন নয়। এর মধ্য দিয়ে ফিরে আসছে বাংলার নদী, মাঝি, সারিগান আর লোকজ জীবনের এক চিরচেনা ছবি।

নদীর বুকে শত বৈঠার একসঙ্গে ওঠানামা যেন মনে করিয়ে দেয়—বাংলার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নদীর সম্পর্ক এখনো অটুট। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত লোকজ উৎসবের আয়োজন করা জরুরি।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!