আদা আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ জন্য উন্নত জাতের আদা চাষ, মানসম্মত বীজ সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং বস্তায় আদা চাষের সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ‘মসলা ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে আদা উৎপাদন বাড়াতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন আদার চাহিদা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে আদা উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার টন। ওই বছর চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টন। তবে আমদানি করা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার টন আদা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন, ভারত, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে ১ লাখ ৪১ হাজার টনের বেশি আদা আমদানি করতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
ওই অর্থবছরে ভারত থেকে ৬১ হাজার ৪২৮ টন আদা আমদানি করতে ব্যয় হয়েছে ৩৮৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। চীন থেকে ৪৩ হাজার ৩৮ টন আদা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৫৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে ৩০ হাজার ৩৪৭ টন, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৪ হাজার ৯৭২ টন এবং থাইল্যান্ড থেকে ১ হাজার ৬৭৯ টনের বেশি আদা আমদানি করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বার্ষিক আদার চাহিদার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে প্রয়োজনীয় এই মসলা আমদানিতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে।
উৎপাদন বাড়াতে যেসব উদ্যোগ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আদা চাষের অনুকূল আবহাওয়া ও মাটি থাকলেও উন্নত জাতের অভাব, দীর্ঘ ফসলচক্র, রোগবালাই, ছত্রাকের সংক্রমণ এবং সনাতন চাষপদ্ধতির কারণে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হচ্ছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের চাষ সম্প্রসারণ, মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পাহাড়ি এলাকায় সেচসুবিধা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তায় আদা চাষ এবং ফসলের সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীন বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এম মাসুদ আলম বাসসকে বলেন, বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত উপযোগী ও লাভজনক। এ পদ্ধতিতে বাড়ির আঙিনা বা অল্প জায়গাতেও আদা উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, মাত্র ৫০ গ্রাম আদার বীজ রোপণ করে একটি বস্তা থেকে ১ থেকে দেড় কেজি আদা উৎপাদন করা যায়।
এম মাসুদ আলম আরও বলেন, বস্তায় আদা চাষের কর্মসূচি সফল করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে বারি-২ ও বারি-৩ জাতের উচ্চফলনশীল আদার বীজ বিতরণ করা হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি হেক্টরে আদার উৎপাদন প্রায় ১৭ টন। উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহার করে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বস্তায় আদা চাষে বাড়ছে আগ্রহ
জমির স্বল্পতা ও চাষাবাদের সুবিধার কারণে বস্তায় আদা চাষ কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা এখন বাণিজ্যিকভাবেও এ পদ্ধতিতে আদা চাষ করছেন। তাঁদের অনেকেই এ চাষ থেকে ভালো মুনাফার আশা করছেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ছোটকুয়া গ্রামের কৃষক সোহেল প্রধান বলেন, প্রথমবারের মতো তিনি বাড়ির পুকুরপাড়ের আশপাশে ১ হাজার ৮০০টি বস্তায় আদা চাষ করেছেন। এ চাষ থেকে ভালো মুনাফা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন আদার চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২৬ হাজার ১৯৪ হেক্টর জমিতে আদা উৎপাদিত হয়েছে ৯৪ হাজার ২৬ টন।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বস্তায় আদা চাষের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এ পদ্ধতিতে আরও বেশি কৃষককে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!