বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। বিশেষ করে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
এতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৪১৫ মেগাওয়াট। এই সক্ষমতার মধ্যে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ ১ হাজার ২০০ দশমিক ৯৪ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের বাইরে ৩৭৭ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে অন্তত ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে সরকারের কোষাগারের ওপর চাপ কমবে। যেসব পরিবারের বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, তারাও বিদ্যুৎ বিল কমাতে পারবেন।
তিনি বলেন, দিনের বেলায় শিল্পকারখানাগুলোকে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ১৬ টাকা ৬ পয়সা পর্যন্ত দিতে হয়। অন্যদিকে, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
শফিকুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৪ থেকে ৫ টাকা। আর ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এ ব্যয় ৮ থেকে ৯ টাকা। সরকার জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা দিলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় প্রায় ৬ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এসব সুবিধা না থাকলে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯ টাকা।
ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেলের বিদ্যুৎ সরাসরি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যায়। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ কিনতে হয়। তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয়, অর্থায়নের ধরন, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় হয় ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। ফার্নেস অয়েল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ ব্যয় ২৭ টাকা ৪০ পয়সা। অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় প্রায় ৭ টাকা ৯ পয়সা।
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও সৌরবিদ্যুৎ
শেরপুরের নকলা উপজেলার হুজুরীকান্দা গ্রামে মতি অ্যাগ্রিভোলটাইক প্রকল্পে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পটির পরিচালক শহিদুল ইসলাম জানান, নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সেচ ও কার্যালয়ের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে মোট ৩৫ দশমিক ৩ কিলোওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
এর মধ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের জন্য ২৬ দশমিক ৫ কিলোওয়াট এবং সেচপাম্প ও কার্যালয়ের জন্য ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে।
শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন গড়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ। ফলে প্রকল্পটিতে লোডশেডিং হয় না। সৌর প্যানেল স্থাপনে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। ব্যবস্থাটির আনুমানিক আয়ুষ্কাল ২৫ বছর।
তিনি আরও জানান, রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের ব্যয় বাদে তাঁদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় সাড়ে ৩ টাকা।
একটি সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, কোনো বাড়িতে প্রায় নয় ঘণ্টার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ সংরক্ষণক্ষমতাসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে ২০ বছরে প্রতি ইউনিটের আনুমানিক ব্যয় ৭ টাকা ৪৩ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমেছে
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার ব্যয় কমানো ও এর ব্যবহার বাড়াতে সরকার সম্প্রতি নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এ সুবিধা ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে।
এ ছাড়া ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের আরও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬–২০৩০ মেয়াদি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, সরকারের লক্ষ্য অর্জনে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৯ টাকা ১২ পয়সা দরে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১২টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বিপিডিবি।
তিনি আরও বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে গ্রিড-সংযুক্ত ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকার নতুন বাণিজ্যিক, শিল্প ও সরকারি ভবনে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের শর্ত বাস্তবায়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে, যেসব স্থাপনার বৈদ্যুতিক লোড ১০ কিলোওয়াটের বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে এ শর্তের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের প্রসার বাড়াতে প্রাথমিক বিনিয়োগের পাশাপাশি সহজ শর্তে অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং শহরের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এ ধরনের অর্থায়ন কার্যকর হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমানো, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশদূষণ হ্রাসেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তবে প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয়ের হিসাব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থাপন ব্যয়, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি ব্যবহারের প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিদ্যুতের ট্যারিফ বিবেচনায় মূল্যায়ন করা জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদে প্রকৃত সাশ্রয় নির্ভর করবে এসব ব্যয় ও উৎপাদিত বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহারের ওপর।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!