আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার, মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সফট পাওয়ার বা কোমল শক্তির হাতিয়ার হিসেবে সংস্কৃতিকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
আজ রোববার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘কাজী নজরুল ইসলাম: দ্য ইউনিভার্সাল ভয়েস অব ফ্রিডম অ্যান্ড হিউম্যানিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এ সেমিনারের আয়োজন করে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও পরিচয় তুলে ধরতে সংস্কৃতি একটি কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বর্তমান বাস্তবতায় কূটনীতি শুধু সংলাপ, আলোচনা কিংবা প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে সংস্কৃতির শক্তিকেও কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, সৃজনশীল মেলবন্ধন ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরারও লক্ষ্য রয়েছে।
নজরুলের সৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক কূটনীতির সম্ভাবনা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সম্প্রীতি ও মানবিক সংহতির কবি হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমানা পেরিয়ে মানবতার বার্তা পৌঁছে দিতে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত সাংস্কৃতিক কূটনীতির শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের ঐতিহ্য প্রমাণ করে, সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে বিভিন্ন সমাজকে যুক্ত করতে এবং জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে পারে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের পরিচয় এবং শান্তি, সহনশীলতা ও আন্তর্জাতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে নজরুলের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর গুরুত্ব শুধু স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম ও সর্বজনীন বার্তা বিশ্বজুড়ে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দর্শন সহনশীলতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে বাঙালি পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব মূল্যবোধ বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গভীরভাবে প্রোথিত এবং সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজরুলকে আরও বেশি তুলে ধরলে বাংলাদেশকে শান্তি ও উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আত্মবিশ্বাসী দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হবে। বিশ্বজুড়ে নজরুলের সৃষ্টিকর্মের চর্চা বাড়লে তাঁর দর্শনের মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত হবে এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সহযোগিতার নতুন পথ তৈরি হবে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান এবং কবি আবদুল হাই শিকদার। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন।
আলোচনা পর্ব শেষে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!