জাতীয়

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ শোধের চাপে বাংলাদেশ, রিজার্ভে বাড়তি চাপ

আপডেট: অক্টো ২১, ২০২৬ : ০৫:৪৩ এএম ৭ ০
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ শোধের চাপে বাংলাদেশ, রিজার্ভে বাড়তি চাপ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে।

অন্যদিকে, আগামী পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পর্যাপ্ততা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের এই অবস্থান কিছুটা স্বস্তি দিলেও আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে।

পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ বাবদ দিতে হবে প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এরপর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে নেওয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ বাড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল ও বিমানবন্দর সম্প্রসারণের মতো প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় বা শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকায় মূল ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে।

ঋণ পরিশোধের এই দায় শুধু সরকারি বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে না, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ সাধারণত ডলারের মতো বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। তবে রিজার্ভের ওপর প্রকৃত চাপ কতটা হবে, তা নির্ভর করবে একই সময়ে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, নতুন বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার প্রবাহ এবং আমদানি ব্যয়ের ওপরও।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে আমদানি ব্যয়েও চাপ

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে বেশি ডলারের প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। আবার টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিকারকদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়ে না, পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমে অন্যান্য পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ে। চাল, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের দেশীয় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। শুল্ক কমানো বা আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে এবং ডলারের বিনিময় হার প্রতিকূলে থাকলে ব্যয় পুরোপুরি কমানো কঠিন।

তবে রিজার্ভের ওপর চাপ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম পরিবর্তনের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ, মূল্য পরিশোধের সময়সূচি এবং বিনিময় হারের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রবৃদ্ধি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ঝুঁকি

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি কমলেই রপ্তানি আয় বা বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে, এমন নয়। তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা কমে গেলে কিংবা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবাসী আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি তৈরি হয়। এ প্রবাহ ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ করা, বিনিময় হারে বাস্তবসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রণোদনা কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসার পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা এবং মুনাফা দেশে আনা-নেওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হতে পারে। তাই রিজার্ভের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু আমদানি কমানোর ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও বিনিয়োগ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বৈদেশিক ঋণ নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা

আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে শুধু এই অঙ্কের ভিত্তিতে ঋণসংকট বা রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা ঠিক হবে না। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ঋণের শর্ত, সুদের হার, মেয়াদ, নতুন ঋণপ্রবাহ এবং সরকারি রাজস্বের ওপর।

দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের ঋণের ঝুঁকি স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের মতো নয়। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বিবেচনা করা জরুরি।

বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবহন সুবিধা ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা-ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সুফল ও ঋণ পরিশোধের দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেট ও বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে।

রিজার্ভের ওপর চাপ সামাল দেওয়ার উপায়

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। দুই হিসাবের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে শুধু মোট অঙ্ক দেখলে হবে না; বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয়ের প্রবাহ, আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা এবং আসন্ন ঋণ পরিশোধের সময়সূচিও বিবেচনায় নিতে হবে। রেমিট্যান্স বাড়লেই সব ধরনের চাপ দূর হবে না, আবার ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বাড়লেই রিজার্ভ দ্রুত কমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

রিজার্ভের ওপর চাপ সামাল দিতে প্রথমেই বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এ জন্য রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বৈধ পথে প্রবাসী আয় আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। কোন বছরে কত ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, কোন প্রকল্প থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল আসবে এবং নতুন ঋণ নিলে ভবিষ্যৎ দায় কতটা বাড়বে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অর্থের প্রয়োজনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, আমদানি ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। নির্বিচারে আমদানি সংকোচন করলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। তাই কোন পণ্য আমদানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সতর্ক নীতি প্রয়োজন।

চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় জরুরি। বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নত করলে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অঙ্ক ধরে রাখা নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস শক্তিশালী করা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।


আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!