জাতীয়

সংস্কারে নতুন রূপ পাবে বাংলা একাডেমির ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’

আপডেট: অক্টো ২৪, ২০২৬ : ০৫:৪৬ এএম ১ ০
সংস্কারে নতুন রূপ পাবে বাংলা একাডেমির ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’

বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের দোতলায় অবস্থিত ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এই কক্ষের দরজায় গিয়ে কখনো তালা ঝুলতে দেখা যায়, কখনো আবার পাওয়া যায় প্রবেশের সুযোগ।

কক্ষটির অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেকেরই জানা নেই। ভেতরে রয়েছে কবির বিভিন্ন সময়ের ছবি, বইপত্র, পাণ্ডুলিপি ও স্মৃতিচিহ্ন। তবে এসব উপকরণ আরও পরিকল্পিতভাবে সাজানো এবং কক্ষটির পরিচিতি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন নজরুল গবেষক ও সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নজরুলবর্ষ উপলক্ষে স্মৃতিকক্ষটির সংস্কার ও নতুনভাবে সাজানোর কাজ চলছে। বিরল আলোকচিত্র যুক্ত করে কক্ষটিকে আরও নান্দনিক করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলা একাডেমি। পাশাপাশি নজরুলবিষয়ক গবেষণাধর্মী বইয়ের সংগ্রহ বাড়ানো এবং কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির গুরুত্ব তুলে ধরার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম জানিয়েছেন, স্মৃতিকক্ষটির সংস্কার ও নতুন রূপ দেওয়ার জন্য আলোকচিত্রী ও লেখক নাসির আলী মামুনের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। তিনি কবির দুর্লভ কিছু আলোকচিত্রও দিয়েছেন। সেগুলো সাজানোর কাজ চলছে।

যে ঘরে কেটেছিল নজরুলের দিন

১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এ সময় তিনি বর্ধমান হাউসে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন। ভবনটি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কবির বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের বাসভবন ছিল।

বর্ধমান হাউসের পাশের পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটতেন নজরুল। বিকেল ও সন্ধ্যায় পুকুরঘাটে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। কখনো একাও বসে সময় কাটাতেন সেখানে।

কবির সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে ১৯৭৮ সালের ২৯ আগস্ট ভবনটির দোতলার পশ্চিম পাশে তাঁর ব্যবহৃত ঘরটি ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে কক্ষটি কবির জীবন ও সাহিত্যচর্চার স্মারক হিসেবে টিকে আছে। তবে এর সংরক্ষণ, উপকরণের যথাযথ উপস্থাপন এবং দর্শনার্থীদের কাছে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ছবিতে-স্মৃতিতে কবির জীবন

বর্ধমান হাউসের দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে এক পাশে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, অন্য পাশে নজরুল স্মৃতিকক্ষ। কক্ষের সামনে কবি নজরুল ও ‘বিষাদসিন্ধু’র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনের আবক্ষ ভাস্কর্য রয়েছে।

কক্ষটির ভেতরে নজরুলের বিভিন্ন সময়ের ছবি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের আলোকচিত্র, বইপত্র ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। তিনটি ছোট বইয়ের আলমারিতে সাজানো রয়েছে বই ও সাময়িকী। একটি টেবিলে রাখা আছে নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবীর ছবি, কবির গানের খাতা ও পাণ্ডুলিপি। অন্য একটি টেবিলে ফুলদানির পাশে রয়েছে কবির ছোট আবক্ষ মূর্তি। আছে তৎকালীন ঢাকার লেখক সমাজের সঙ্গে নজরুলের সাদাকালো ছবিও।

কক্ষটি ছোট হলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। তবে বেশ কিছু ছবির পাশে পরিচিতিমূলক ক্যাপশন নেই। নতুন সংগ্রহের কিছু উপকরণও এখনো পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়নি। ফলে ছবিগুলোর পরিচয় জানা এবং সেগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা দর্শনার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

সংস্কারের কাজ শেষ হলে এসব সীমাবদ্ধতা কতটা দূর হবে, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে নজরুলপ্রেমীদের।

স্মৃতিকক্ষের পাশাপাশি পুকুরের পরিচিতিও জরুরি

প্রখ্যাত নজরুল গবেষক ও কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নজরুল স্মৃতিকক্ষ সংস্কারের কথা শুনছেন তিনি। কিন্তু এত দিন কেন কাজটি হয়নি, তা তাঁর জানা নেই।

কক্ষটির পাশাপাশি বাংলা একাডেমির পুকুরটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, পুকুরটিকে ‘নজরুল স্মৃতিবিজড়িত পুকুর’ হিসেবে চিহ্নিত করে ঘাটে বড় একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে। নজরুলবর্ষে এমন উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে।

নজরুল গবেষণায় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক আনোয়ারুল হক মনে করেন, স্মৃতিকক্ষে নজরুলবিষয়ক গবেষণাধর্মী বইয়ের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঢাকায় অবস্থানকালে কবি কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং কী কী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তার একটি দিনপঞ্জি রাখা যেতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলা একাডেমিতে নজরুল স্মৃতিকক্ষ রয়েছে, এ তথ্য অনেকেই জানেন না। কক্ষটির পরিচিতি বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন।

কবি ও গীতিকার মহসিন আহমেদও বাংলা একাডেমির জাদুঘরগুলোর পরিচিতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, একাডেমির প্রধান ফটকে বিভিন্ন জাদুঘরের অবস্থান দেখিয়ে একটি মানচিত্র রাখা হলে দর্শনার্থীরা সহজেই সেগুলো খুঁজে পাবেন।

সংস্কারে যুক্ত হচ্ছে দুর্লভ আলোকচিত্র

স্মৃতিকক্ষটির সংস্কার ও নতুনভাবে সাজানোর বিষয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, নজরুলের নামে আলাদা একাডেমি বা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সুযোগ সীমিত হলেও স্মৃতিকক্ষটি উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সংস্কার ও নতুন রূপ দেওয়ার জন্য আলোকচিত্রী ও লেখক নাসির আলী মামুনের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। তিনি নজরুলের দুর্লভ কিছু ছবি দিয়েছেন। সেগুলো সাজানোর কাজ চলছে।

কক্ষটি ছোট হওয়ায় সব ছবি সেখানে রাখা সম্ভব হবে না উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, যতটা সম্ভব নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। নজরুলের ওপর গবেষণাধর্মী বইয়ের সংগ্রহও রয়েছে, যা আরও বাড়ানো হবে।

পুকুরটির পরিচিতি বাড়ানোর প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে নিয়ম মেনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গবেষণা ও নতুন প্রজন্মের নজরুলচর্চা

নজরুল স্মৃতিকক্ষের গুরুত্ব কেবল কবির স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তাঁর জীবন, সাহিত্য, সংগীত এবং ঢাকায় অবস্থানকালের ইতিহাস নিয়ে গবেষণারও একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র।

কক্ষটির সংগ্রহ পরিকল্পিতভাবে সাজানো, প্রতিটি ছবির পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরা, গবেষণার বই বাড়ানো এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশের সুযোগ নিয়মিত ও সহজ করা গেলে এর কার্যকারিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির প্রধান ফটকে জাদুঘরগুলোর নির্দেশনামূলক মানচিত্র ও স্মৃতিকক্ষের অবস্থান জানিয়ে দৃশ্যমান সাইনবোর্ড স্থাপন করলে দর্শনার্থীদের আগ্রহও বাড়বে।

নজরুলবর্ষে সংস্কারের উদ্যোগ তাই কেবল একটি কক্ষের সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়; বরং জাতীয় কবির স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলা একাডেমির এই স্মৃতিকক্ষ নজরুলচর্চা ও গবেষণার আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!