জাতীয়

বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী মোটরযান, জ্বালানি, প্রযুক্তি, রেল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের আহ্বান

আপডেট: অক্টো ২৯, ২০২৬ : ০৩:২৬ এএম ৩ ০
বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী মোটরযান, জ্বালানি, প্রযুক্তি, রেল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের আহ্বান

বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খাতগুলো হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।

আজ বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে টোকিওতে জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার (জেট্রো) হলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং ব্যবসার নতুন সুযোগ সৃষ্টির জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাত বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম।

তিনি বলেন, সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি ডলার। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নেওয়ার সময় এসেছে। আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে এখন ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি ছিল জাপান। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফর এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করতে তাঁদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে নতুন সুযোগ

তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এ ধরনের এটিই প্রথম চুক্তি।

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাজার, তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের বড় সম্পদ। দেশের মানুষের মধ্যম বয়স ২৭ বছর। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মোটরযান ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান

মোটরযান উৎপাদনকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি মাসের শুরুতে টয়োটা বাংলাদেশে একটি যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে কারখানাটিতে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে টয়োটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

জ্বালানি খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনার আওতায় জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে। এ খাতে জাপানের জেরা (জেইআরএ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা

প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্রিক উদ্ভাবনমুখী তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মহাকাশবিষয়ক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে জাপানের মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশ।

উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা

রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ।

এ জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার মতো কাজে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তা চান তিনি।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। জাপানি কোম্পানিগুলো দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে গুরুত্ব

জাপানি কোম্পানিগুলোর উত্থাপিত উদ্বেগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্কছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কথা সরকার শুনেছে। এসব সমস্যার সমাধান এবং আরও ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।

তারেক রহমান বলেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রয়োজন। এ দুটো নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।

জাপানি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব

দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জাপানে যান। পরে দেশে ফিরে তাঁরা অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগান।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি লাখ লাখ তরুণকে জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

জাপানি ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীরা দুই দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

তিনি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করে উভয় দেশের জনগণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

অর্থনৈতিক ফোরামে ব্যবসায়ী নেতারা

বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জেট্রো ও জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা। এ সময় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় এবং বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশে বিনিয়োগ সহজতর করতে সরকারের সংস্কার ও নতুন উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।

এ ছাড়া মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানির ঢাকা শাখার মহাব্যবস্থাপক ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনিচিরো কাওয়ামোতো ‘টুগেদার ফর আ ব্রাইটার বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপস্থাপনা দেন। ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!