দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে সরকারি ডাটাবেজে আট কোটির বেশি খতিয়ান বা পর্চা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে জমির রেকর্ড সংগ্রহ, খতিয়ান যাচাই এবং নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা গ্রহণ সহজ হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সব খতিয়ান অনলাইনে পাওয়া গেলে ভূমি অফিসে মানুষের যাতায়াত কমবে, সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি জমিজমা নিয়ে বিরোধ কমাতেও সহায়ক হতে পারে এ উদ্যোগ।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড রুমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত আট কোটির বেশি খতিয়ান ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হয়েছে। তবে এই সংখ্যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড রয়েছে। সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস জরিপের খতিয়ানের পাশাপাশি ই-নামজারির মাধ্যমে তৈরি ও হালনাগাদ হওয়া খতিয়ানও এতে অন্তর্ভুক্ত।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পারভেজ হাসান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, দেশের সব খতিয়ান সরকারি ব্যবস্থায় অনলাইনে যুক্ত করার লক্ষ্যে ডেটা এন্ট্রির কাজ চলছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় ইতিমধ্যে ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়েছে।
তিনি জানান, পরবর্তী সময়ে সারা দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য একটি ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
ডাটাবেজে রয়েছে বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন সার্ভে খতিয়ানের ডাটাবেজে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ থেকে পাঁচ কোটি ১৩ লাখ খতিয়ান রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ খতিয়ান অনলাইনে উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ই-নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসেবা ডিজিটাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাটাবেজে রেকর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।
প্রকল্প পরিচালক পারভেজ হাসানের মতে, সব খতিয়ান অনলাইনে পাওয়া গেলে জমির রেকর্ড খুঁজতে নাগরিকদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হবে না। নিজের জমির খতিয়ান ঘরে বসেই সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
প্রতি মাসে নিষ্পত্তি হচ্ছে পাঁচ লাখ নামজারি মামলা
দেশের উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ই-নামজারি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ৩ হাজার ৪৬৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এ কার্যক্রম চলছে। অনলাইনে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ লাখ নামজারি মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে।
জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের তথ্য হালনাগাদ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলো নামজারি। জমি কেনা, উত্তরাধিকার বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে মালিকানা পরিবর্তনের পর নিয়ম অনুযায়ী নামজারি করতে হয়।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় আবেদন করা, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই, মামলার অগ্রগতি দেখা এবং সিদ্ধান্ত জানার কাজ সহজ হয়েছে। আগে এসব কাজে অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার ভূমি অফিসে যেতে হতো। অনলাইন সেবার ফলে সেই নির্ভরশীলতা কমছে।
ভূমি উন্নয়ন কর ও ই-পর্চায় বাড়ছে ডিজিটাল সেবা
ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে আদায়, ই-পর্চা ও ই-নামজারি—এই তিনটি সেবা ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ কোটি ৭০ লাখ হোল্ডিংয়ের তথ্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ১০ লাখ অনলাইন দাখিলা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত ভূমিসেবার বিভিন্ন খাতে রাজস্ব জমার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে ই-পর্চার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সরকারের কোষাগারে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে।
ডিজিটাল খতিয়ানের মাধ্যমে জমির দাগ নম্বর, রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম ও জমির পরিমাণ সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া সহজ হচ্ছে। জমি কেনাবেচার আগে ক্রেতা এসব তথ্য যাচাই করতে পারেন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড খোঁজা, পুরোনো দলিলের সঙ্গে খতিয়ান মিলিয়ে দেখা এবং নামজারির প্রস্তুতি নেওয়ার কাজও এতে সহজ হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এ সেবা কার্যকর হতে পারে। বিদেশে বসে জমির রেকর্ড খুঁজে দেখার সুযোগ থাকলে দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরতা কমবে। তবে প্রয়োজনীয় পরিচয় যাচাই, অনুমোদিত আবেদন ও সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
নির্ভুল তথ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল রেকর্ড ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। নথি সংরক্ষণ, তথ্য অনুসন্ধান, আবেদন ও ফি পরিশোধের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে থাকলে সেবার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণও সহজ হয়। এতে কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়া বা নথি খুঁজে পেতে দীর্ঘসূত্রতার ঝুঁকি কমতে পারে।
তবে ডিজিটাল ভূমিসেবার সুফল নিশ্চিত করতে ওয়েবসাইট ও সার্ভারের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম, তথ্যের নিরাপত্তা, সহজ ব্যবহারব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, কেউ নিজের জমির তথ্য খুঁজে না পেলে, ভুল তথ্য সংশোধন করতে না পারলে কিংবা আবেদনের অগ্রগতি জানতে না পারলে ডিজিটাল সেবার প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি ভূমি অফিসগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারা দেশে ১ হাজার ৩৩০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ১৫০টি সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব অবকাঠামো নির্মিত হলে ভূমির নথি সংরক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ এবং নাগরিকদের সেবা গ্রহণের পরিবেশ উন্নত হবে। পুরোনো কাগজের নথি নিরাপদে সংরক্ষণ করা গেলে সেগুলো ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত করাও সহজ হবে। কারণ, ডিজিটাল তথ্যের নির্ভুলতা অনেকাংশে নির্ভর করে মূল নথির পাঠযোগ্যতা, সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ওপর।
ড্রোনে জরিপ ও এনআইডিতে তথ্য অনুসন্ধানের পরিকল্পনা
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ড্রোন ব্যবহার করে ভূমি জরিপের বিষয়টিও রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জরিপের সময় কমানো ও তথ্য সংগ্রহের নির্ভুলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জমিসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, রাজস্ব মামলা ব্যবস্থাপনা এবং ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ কমানোর ক্ষেত্রেও ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে। সরকারি জমির রেকর্ড সহজে অনুসন্ধান করা গেলে জমি দখল, রেকর্ডের অসামঞ্জস্য ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বাসসকে বলেন, ‘ভূমিসেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সরকার ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করছে। সব খতিয়ান পর্যায়ক্রমে অনলাইনে আনা সম্ভব হলে নাগরিকেরা ঘরে বসেই তাঁদের জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভূমি অফিসে মানুষের যাতায়াত কমবে। একই সঙ্গে ভূমির রেকর্ড সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জমিজমা নিয়ে বিরোধ কমাতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার সুফল নিশ্চিত করতে তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সহজে সেবা পাওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পাশাপাশি পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণ ও যাচাই, ভুল তথ্য সংশোধন এবং নাগরিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।’
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!