জাতীয়

ভর্তুকি ৫০০ কোটি টাকা কমাতে চায় টিসিবি, লক্ষ্য আর্থিক স্বনির্ভরতা

আপডেট: নভে ০২, ২০২৬ : ০৫:৩৭ এএম ৫ ০
ভর্তুকি ৫০০ কোটি টাকা কমাতে চায় টিসিবি, লক্ষ্য আর্থিক স্বনির্ভরতা

সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এ লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির ব্যয় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ জন্য পণ্য কেনার খরচ, ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ভর্তুকির আওতায় বিক্রি করা পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বাসসকে বলেন, সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে আমরা ভর্তুকির ব্যয় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছি। তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লে সংস্থার মোট ভর্তুকির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।’

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পণ্য কেনা ও বিক্রির দামের পার্থক্য এবং ব্যাংকঋণের সুদ ভর্তুকির বড় দুটি উৎস।

ব্যাংকঋণের সুদ কমানোর উদ্যোগ

টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থাটির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কেনা দামের তুলনায় অনেক কম দামে পণ্য বিক্রি করা। কিছু পণ্য কেনা দামের চেয়ে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম দামে বিক্রি করতে হয়। এর মধ্যে ভোজ্যতেলে ভর্তুকির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

২০২২ সাল থেকে টিসিবি প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকায় বিক্রি করছে। অথচ বর্তমানে ডিলার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়সহ প্রতি লিটার তেল কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। ব্যাংকঋণের সুদ যোগ করলে এ ব্যয় প্রায় ২০০ টাকায় দাঁড়ায়।

ব্যাংকঋণের সুদ কমাতে ঋণপত্র (এলসি) ও ঋণপত্রের বিপরীতে ঋণ (এলটিআর) সুবিধার পরিবর্তে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কেনায় এলসি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমেছে প্রায় ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

বর্তমানে টিসিবির বার্ষিক ব্যাংকঋণের সুদ ব্যয় প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। এ ব্যয় থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ‘আমরা ঋণপত্র (এলসি) এবং ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা কমাচ্ছি। যেখানে সম্ভব, নগদ অর্থে পণ্য কেনা হচ্ছে।’

এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কম সুদে ঋণসুবিধা পাওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলা ও এলটিআর সুবিধা নেওয়া শুরু করেছে টিসিবি।

বিক্রির অর্থ দ্রুত জমার ব্যবস্থা

টিসিবির বিক্রির অর্থ দ্রুত সংস্থার ব্যাংক হিসাবে জমা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই)। আগে বিক্রির অর্থ জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) হিসাবের মাধ্যমে টিসিবির কাছে আসত। নতুন ব্যবস্থায় ডিলারদের কাছ থেকে বিক্রির অর্থ সরাসরি ও দ্রুত সংস্থার হিসাবে জমা হবে।

এতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নগদ অর্থে পণ্য কেনা সহজ হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

বাণিজ্যিক পণ্যে আয় বাড়ানোর চেষ্টা

ভর্তুকির পণ্যের বাইরে আয় বাড়াতে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাজারে এনেছে টিসিবি। এসব পণ্য প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হলেও কেনা দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি।

টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুধু ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব নয়। আমাদের আয়ও বাড়াতে হবে।’

এদিকে পরিবহন, পণ্য ওঠানো-নামানোসহ বিভিন্ন খরচ কমাতে বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে আঞ্চলিক গুদাম থেকে পণ্য জেলা প্রশাসনের গুদামে পাঠানো হতো। এখন আঞ্চলিক গুদাম থেকেই সরাসরি পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

জরিপের কাজেও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান, জরিপ ও এ-সংক্রান্ত কাজে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। একই ধরনের জরিপের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা গেলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

উপকারভোগী বাড়ানোর লক্ষ্য

ব্যয় কমানোর পাশাপাশি টিসিবির উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত পণ্যসহ সংস্থাটির কার্যক্রমের আওতায় প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ পণ্য কিনছেন। চলতি অর্থবছরে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফয়সল আজাদ বলেন, ‘চলতি বছর ৮০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে আগামী অর্থবছরে এক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর আশা করছি।’

তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লে ভর্তুকির মোট পরিমাণও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

বিদ্যমান ভর্তুকির পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই জানিয়ে টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, এসব পণ্য আগের দামেই বিক্রি করা হবে। নতুন বাণিজ্যিক পণ্যও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এসব পণ্য কেনা উপকারভোগীদের জন্য সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। কাউকে তা কিনতে বাধ্য করা হবে না।

টিসিবির আশা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!