জাতীয়

শৃঙ্খলায় ফিরছে অটোরিকশা, নিবন্ধনের আওতায় আসছে সব সিটি করপোরেশন

আপডেট: নভে ০২, ২০২৬ : ০৫:৪৫ এএম ৫ ০
শৃঙ্খলায় ফিরছে অটোরিকশা, নিবন্ধনের আওতায় আসছে সব সিটি করপোরেশন

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা (ই-রিকশা) চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। এখন থেকে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে ই-রিকশার নিবন্ধন, রুট ও জোন নির্ধারণ, চলাচলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কারিগরি মান নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলো। নিবন্ধন ও নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না।

নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট রং ও রুটে চলাচল, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যাত্রী পরিবহনের সীমা, ব্যাটারি চার্জিং এবং পরিবেশ সুরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ শিরোনামে প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত বিধিমালাটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ১২০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি সিটি করপোরেশন সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের আওতাধীন এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে, তা নির্ধারণ করবে। প্রয়োজনে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকা অথবা পৃথক জোনভিত্তিকভাবে এই সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হাসান বাসসকে বলেন, ‘ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করতেই নতুন বিধিমালা করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, দেশের সব সিটি করপোরেশনে একই নীতিমালার ভিত্তিতে ই-রিকশার নিবন্ধন ও চলাচল নিয়ন্ত্রিত হলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি রোধ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পর্যায়ক্রমে সব সিটি করপোরেশনকে এ বিধিমালার আওতায় আনা হবে।

নিবন্ধনে থাকছে নির্দিষ্ট শর্ত

নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট আকারের ছবি, ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফরমে ফিটনেস সার্টিফিকেটসহ আবেদন করতে হবে।

কর্তৃপক্ষ আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ই-রিকশার উপযুক্ততা পরীক্ষা করবে।

সব শর্ত পূরণ হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। কোনো আবেদন নামঞ্জুর হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন।

একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে একটি সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।

বিধিমালার তফসিল অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। ফিটনেস সার্টিফিকেটের জন্য দিতে হবে এক হাজার টাকা। নিবন্ধন ও নবায়ন থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের রাজস্ব হিসেবে গণ্য হবে।

নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। চালককে বিনামূল্যে নম্বর প্লেট এবং যানবাহনের বিস্তারিত তথ্যসংবলিত ব্লু-বুক সরবরাহ করা হবে। এতে সংশ্লিষ্ট চার্জিং স্টেশন বা চার্জিং গ্যারেজের তথ্যও উল্লেখ থাকবে।

ই-রিকশার দৃশ্যমান স্থানে নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শন করতে হবে, যাতে সহজেই নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত যানবাহন শনাক্ত করা যায়। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে তা নবায়ন করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুসারে নকশা ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না। বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলোকেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংশোধনের মাধ্যমে নতুন মানদণ্ডের উপযোগী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব যানবাহনকে বিমার আওতায় আনার বিধানও রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান বাসসকে বলেন, নতুন বিধিমালা অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন এবং জোনভিত্তিক চলাচলের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কোন এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে এবং কোন রুট ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নিবন্ধিত যানবাহন সহজে শনাক্ত করতে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট ও নির্দিষ্ট রঙের ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

গতিসীমা সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার

নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। প্রতিটি যানবাহনে স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।

নিবন্ধনের তারিখ থেকে একটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। এ সময়সীমা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) প্রধান সড়ক বা করিডোরে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশাসন সময় সময় যেসব সড়কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, সেসব সড়কেও এসব যান চলতে পারবে না। ফুটপাত দিয়ে ই-রিকশা চালানোও নিষিদ্ধ।

চালকদের সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং এবং অনিয়ম করে লেন পরিবর্তন করা যাবে না।

যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ই-রিকশার ধরন অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীদের হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না। ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।

জোনভিত্তিক চলাচল ও চালকদের প্রশিক্ষণ

ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট ও জোন নির্ধারণ করবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশন এলাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে সংশ্লিষ্ট জোনে চলাচলকারী ই-রিকশার সংখ্যা, নির্দিষ্ট রুট ও যানবাহনের রং চূড়ান্ত করা হবে।

এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না। এতে একই এলাকায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমানো এবং সড়কে যান চলাচল ব্যবস্থাপনা সহজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন বিধিমালায় চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশার রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যাবে।

এর মাধ্যমে চালকদের সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সচেতন করা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!