জাতীয়

এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে কঠোর ইসি, ১৩ লাখের বেশি আবেদন বাতিল

আপডেট: নভে ০৪, ২০২৬ : ০৫:০৩ এএম ৫ ০
এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে কঠোর ইসি, ১৩ লাখের বেশি আবেদন বাতিল

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকার দাবি এবং পাসপোর্ট পরিবর্তনসহ নানা ক্ষেত্রে জালিয়াতির চেষ্টা হচ্ছে। এমন অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কয়েকজন কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন।

কারও বিরুদ্ধে করা হয়েছে ফৌজদারি মামলা, নেওয়া হয়েছে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ। জালিয়াতি ঠেকাতে এনআইডি সংশোধনের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বাসসকে বলেন, ‘এই অভিযোগে আমাদের অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে আমরা ফৌজদারি মামলা করেছি। তাঁদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও করেছি। সুতরাং আমরা ছাড় দিচ্ছি না।’

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য ও নথিপত্র যাচাই করে সন্তুষ্ট হওয়ার পরই সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কারণ, যথাযথ যাচাই ছাড়া এনআইডির মৌলিক তথ্য পরিবর্তন করা হলে সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি ভুয়া পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সিইসি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তন করে সম্পত্তি বিক্রি করা হয়েছে। কেউ কেউ উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে এনআইডি সংশোধনের চেষ্টা করেছেন। আবার কেউ জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। এসব কারণে যাচাই-বাছাই ছাড়া দ্রুত সংশোধন করে দেওয়া সম্ভব নয়।

জালিয়াতির অভিযোগে কর্মকর্তা বরখাস্ত

ইসি কর্মকর্তারা জানান, এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই অভিযোগে পঞ্চগড় সদরের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

আবেদনে নানা অসংগতি

ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এনআইডি সংশোধনের অনেক আবেদনে তথ্যগত অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাবা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর, আবার মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দুই থেকে তিন বছর। কারও কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত সনদও রয়েছে।

সিইসি বলেন, বিদেশি নাগরিক কিংবা রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ে এনআইডি তৈরি করে ফেলছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তাই এসব আবেদন যাচাই, তদন্ত ও পর্যালোচনা করা জরুরি।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অনেক আবেদনকারী আগের নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জন্মতারিখ সংশোধন করতে চান।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজনের জন্ম ১৯৯৭ সালে এবং তিনি ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হয়েছেন। পরে তিনি জন্মসাল ২০০২ করার আবেদন করেছেন। এতে নিবন্ধনের সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১৩ বছর। অথচ ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। এ ধরনের আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

আখতার আহমেদ আরও বলেন, অনেকে বিদেশে যাওয়ার সমস্যা বা ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা জানিয়ে মানবিক বিবেচনায় তথ্য সংশোধনের আবেদন করেন। কিন্তু যথাযথ যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে ইসিকেই সমস্যায় পড়তে হয়।

যে নথি যাচাই করে ইসি

কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ এনআইডি সংশোধনের আবেদন উপজেলা পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তবে নাম, বাবা-মায়ের নাম ও বয়সের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একসঙ্গে সংশোধনের জটিল আবেদন উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। সেখানে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদসহ প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়।

বাবার নাম পরিবর্তনের আবেদন এলে বাবার এনআইডি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা হয়। শুধু হলফনামার ভিত্তিতে এ ধরনের সংশোধন করা হয় না।

সিইসি বলেন, কেউ নিজের নাম ও বাবার নাম পরিবর্তন করতে চাইলে তাঁর ভাই-বোনদের এনআইডি চাওয়া হতে পারে। তাঁদের পরিচয়পত্রে বাবার নামের সঙ্গে আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। সংশোধনের যথার্থতা নিশ্চিত করতেই এসব নথি চাওয়া হয়।

ভোগান্তির অভিযোগ আবেদনকারীর

এনআইডি সংশোধন করতে এসে ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন যশোরের কেশপুরের হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম)। সম্প্রতি তিনি ইসিতে এসে জানান, ছয় মাস আগে স্ত্রীর নাম সংশোধনের আবেদন করেছিলেন। তখন তাঁকে জানানো হয়, স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। একটি বাতিল করে আনলে সংশোধনের কাজ করা হবে।

পরে একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে ইসিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্ত্রীর ভাই-বোনদের প্রত্যয়নপত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্যসহ আরও কয়েকটি নথি জমা দিতে বলেন। প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে না পারায় এখনো তাঁর স্ত্রীর নাম সংশোধন করা সম্ভব হয়নি।

১৩ লাখের বেশি আবেদন বাতিল

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এনআইডি সংশোধনের ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাতিল হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন।

আবেদন বাতিলের কারণ ব্যাখ্যা করে সিইসি বলেন, অনেক আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য বা জন্মসনদ থাকে না। আবার কারও একাধিক জন্মসনদ, এসএসসি বা স্নাতকের সনদ থাকায় কোন নথির ভিত্তিতে সংশোধন করা হবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে আবেদন বাতিল হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আবার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কোনো আবেদন বাতিল করা হয় না বলে জানান সিইসি।

সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বাতিল হওয়া আবেদনের সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত আবেদনকারীর সংখ্যা বোঝা যাবে না। একজন ব্যক্তি চার-পাঁচবার আবেদন করতে পারেন। আবার একটি আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে একটি সংশোধন করা হলেও অন্যটি বাতিল হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায় পর্যন্ত আবেদন বাতিল হওয়ার পরও সচিব পর্যায়ে আপিলের সুযোগ রয়েছে। সেখানেও আবেদন বাতিল হতে পারে। কোনো কোনো আবেদন ছয়-সাতবার পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। ফলে বাতিলের মোট সংখ্যা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।

প্রবাসীদের সেবা সহজ করার উদ্যোগ

প্রবাসীদের এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা সহজ ও দ্রুত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা। যাঁদের কাগজপত্র সঠিক, তাঁদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সিইসি বলেন, বেশ কয়েকটি দূতাবাসে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু করা হয়েছে। তবে অনেক প্রবাসী সঠিক পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাননি, আবার কেউ কেউ দালালের মাধ্যমে বিদেশে গেছেন। এসব তথ্য যাচাই করতে হয়। সৌদি আরবে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে কাজ করছেন—এমন প্রতিবেদনও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রবাসীদের সব তথ্য ঠিক থাকলে দ্রুত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তাঁদের ভিআইপি মর্যাদায় সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান সিইসি।

আখতার আহমেদ বলেন, অনেকে আগে এনআইডি করলেও পরে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন। এতে দুই নথির তথ্যে অমিল দেখা দেয়। জন্মনিবন্ধন তৈরির সময় এনআইডির তথ্যের সঙ্গে মিল রাখলে এ ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজের ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত থাকায় অনেকে বয়স ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করেন। পরে জটিলতা তৈরি হলে বাবা বা মায়ের নাম পরিবর্তনের আবেদনও করেন।

কোন তথ্য সহজে সংশোধন করা যায়

ইসির লক্ষ্য, নাগরিকেরা যেন ভোটার নিবন্ধনের সময় সঠিক তথ্য দেন, যাতে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন না হয়। তবে ঠিকানা পরিবর্তন, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন এবং ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয় নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশোধন করা যায়।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় এবং জন্মতারিখের মতো মৌলিক তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!