সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৩২২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা দিয়েছে সরকার। সড়ক পরিবহন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৭ হাজার ৮৭৭ জনকে এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের এই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিআরটিএর আইন উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ রাফিউল ইসলাম বাসসকে বলেন, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের নির্ধারিত আর্থিক সহায়তা পাওয়ার বিধান রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হলে ট্রাস্টি বোর্ড বিধি অনুযায়ী সহায়তা দেয়।
তিনি জানান, ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৬২ জনের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। ট্রাস্টি বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ৮৭৭ জনকে ৩২২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ২০৬ কোটি ৮ লাখ টাকা।
সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আহত ১ হাজার ৪৩২ জন, গুরুতর আহত ৬৮৪ জন এবং নিহত ৫ হাজার ৭৬১ জনের পরিবার রয়েছে।
মৃত্যুতে পাঁচ লাখ, গুরুতর আহত হলে তিন লাখ টাকা
সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২-এর ১৪৯ বিধি অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে বা আহত হয়ে পরে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার এককালীন অন্তত পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে।
এ ছাড়া দুর্ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হলে অন্তত তিন লাখ টাকা দেওয়া হবে। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলেও তিন লাখ টাকা সহায়তার বিধান রয়েছে। তবে গুরুতর আহত ব্যক্তি চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন বলে সম্ভাবনা থাকলে পাবেন অন্তত এক লাখ টাকা।
বিধিমালার ১৫০(১) উপবিধি অনুযায়ী, দুর্ঘটনা ঘটার ৯০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরম-৩২-এ আর্থিক সহায়তার আবেদন করতে হয়।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দুর্ঘটনা রোধ জরুরি
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ হাসিবুর রহমান বাসসকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ দেওয়াই সবকিছুর শেষ কথা নয়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং এর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সড়কে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদেরও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ৬২(১) ধারায় দুর্ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট মোটরযানের চালক, কন্ডাক্টর বা তাঁদের প্রতিনিধিকে নিকটস্থ থানা, ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতালে খবর দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় দ্রুত তাঁকে নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
এ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনায় জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী টোল ফ্রি টেলিফোন নম্বর চালুর বিধানও রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, যাত্রী, চালক কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য কেউ ওই নম্বরে ফোন করে জরুরি সহায়তা চাইতে পারবেন।
হাইকোর্টের রায়ে রাসেল সরকারের ক্ষতিপূরণ
সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ারও নজির রয়েছে। এর মধ্যে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চাপায় পা হারানো রাসেল সরকারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাসের চাপায় পা হারান তরুণ প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকার। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা হয়। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।
রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রাসেল সরকারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রাসেল সরকার বাসসকে জানান, হাইকোর্টের রায়ের পর গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ তাঁকে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং চিকিৎসার জন্য ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়েছে। সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) থেকে তাঁকে কৃত্রিম পা লাগানো হয়েছে।
তিনি বলেন, হাইকোর্টের প্রতি তিনি চিরকৃতজ্ঞ। আদালতের রায়ের মাধ্যমে মোট ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তবে দুর্ঘটনায় তাঁর যে ক্ষতি হয়েছে, তা অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!