পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান আইন, নীতি ও পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
তাঁরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রকৃতি সংরক্ষণে সরকার একা কাজ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাবে না। এ জন্য সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আজ শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেলিব্রেটিং ওয়ার্ল্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড নেচার কনজারভেশন ডে ২০২৬’ শীর্ষক দুই দিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী আয়োজনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিইথ্রি) মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির সহযোগিতায় এ আয়োজন করেছে। ৮ ও ৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, গবেষক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী ও তরুণেরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিইথ্রির উপপরিচালক রৌফা খানম। এরপর ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন ফর নেচার কনজারভেশন’ শিরোনামে মূল বক্তব্য দেন সিইথ্রির পরিচালক মো. গোলাম রব্বানী। প্রকৃতি রক্ষার সঙ্গে অর্থনীতিও জড়িত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, পরিবেশ রক্ষাকে শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে সমাজ ও অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই?’ মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন পরিবেশ উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সুন্দরবনে ৫ হাজার দেশীয় গাছ এবং উত্তরা দিয়াবাড়ীতে ৬ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে। তবে শুধু গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। দৈনন্দিন জীবনেও মানুষের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে আর্থিক খাতেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রত্যেক পেশা ও প্রতিষ্ঠানেরই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের এ কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। জলবায়ু কার্যক্রমে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (বিসিএএস) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়। বিশ্বের এক প্রান্তে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব অন্য প্রান্তের মানুষের ওপরও পড়ে। তাই এ সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি জলবায়ু ন্যায্যতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়িত্বশীল আচরণের পাশাপাশি কার্যকর জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। অধ্যাপক আতিক রহমান বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও দায়িত্ব থাকতে হবে।’ সচেতনতা থেকে এখন বাস্তবায়নে যেতে হবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইথ্রির অধ্যাপক এমেরিটাস ও উপদেষ্টা অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশে আইন, নীতি, কৌশল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অভাব নেই। মূল সমস্যা হচ্ছে এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন ও অনুসরণ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘সমস্যাটি আমরা বুঝি কি না, এখন আর সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা এর জন্য যথেষ্ট কিছু করতে প্রস্তুত কি না।’
সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বনায়ন কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতগুলো গাছ লাগানো হয়েছে, সেই সংখ্যা দিয়ে বিচার না করার আহ্বান জানান আইনুন নিশাত। তাঁর মতে, কোন এলাকায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে এবং লাগানোর পর সেগুলো টিকে থাকছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর জোর পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে দুই দিনের আয়োজনের উদ্বোধন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় শুধু নীতি প্রণয়ন বা সচেতনতা সৃষ্টি যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর সমাধান বের করতে হবে।
পরিবেশ খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৃক্ষরোপণ, উপকূলীয় বনায়ন, কার্বন ক্রেডিট, প্লাস্টিক দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নদী ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বনভূমি উদ্ধার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে সরকার।
বনায়নের ক্ষেত্রে শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যা নয়, গাছের প্রজাতি নির্বাচন ও পরবর্তী পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রতিবেশ অনুযায়ী উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
উপকূলীয় এলাকায় বনায়নের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি নির্বাচিত এলাকায় দুই কোটি কেওড়া গাছ লাগানোর উদ্যোগের কথা জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশের কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনা কাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। পলিথিনের বিকল্প নিশ্চিত করার আহ্বান প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিনের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তবে একই সঙ্গে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরিতে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘তিন আর’—কমানো (রিডিউস), পুনর্ব্যবহার (রিইউজ) ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইকেল)—নীতির ওপর জোর দেন তিনি। জৈব বর্জ্য থেকে সার, পশুখাদ্য ও জ্বালানি তৈরির মতো উদ্যোগ বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। নদী ও জলাভূমি রক্ষায় দূষণের উৎস বন্ধ করা, বনভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণ, পরিবেশগত তথ্য ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব তরুণদের পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের পরিবার থেকেই পরিবর্তন শুরু করার আহ্বান জানান শেখ ফরিদুল ইসলাম। বাড়িতে বর্জ্য আলাদা করা, দায়িত্বশীলভাবে পণ্য ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর মতো উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সচেতনতা দরকার। দায়িত্ববোধ দরকার। গবেষণা দরকার। প্রযুক্তি দরকার। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের সমাধান দরকার।’ স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধানের ওপর গুরুত্ব অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ ফেরহাত আনোয়ার পরিবেশ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তবে এই ঘনত্বকে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তরুণদের সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ কীভাবে স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তার উদাহরণ বিশ্বকে দেখানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের জনঘনত্ব যদি এত বেশি হয়, তাহলে আমাদের দেখাতে হবে কীভাবে তরুণেরা পরিবেশকে সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।’ বাংলাদেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ—সুন্দরবন, উপকূলীয় অঞ্চল ও বেঙ্গল ফ্যান—সংরক্ষণে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী সমাধান তৈরির পাশাপাশি সেই জ্ঞান মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান অধ্যাপক ফেরহাত আনোয়ার।
ব্র্যাকের সঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্র্যাকের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।
জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতার পাশাপাশি জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী সামনে রেখে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে একাডেমিয়া, তরুণ, জনগোষ্ঠী, সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন উপাচার্য।
দুই দিনের এ আয়োজনে আরও থাকছে প্যানেল আলোচনা, পরিবেশ কার্নিভাল, বিভিন্ন ইন্টার্যাকটিভ কার্যক্রম, তরুণদের জন্য জলবায়ুবিষয়ক সেশন, প্রদর্শনী এবং জ্ঞান বিনিময় কর্মসূচি।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!