নিজস্ব প্রতিবেদক

৬৪ জেলার প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতায় তৈরি ‘জাতীয় যুব জলবায়ু অবস্থানপত্র’

আপডেট: সেপ্টে ২৩, ২০২৬ : ০৬:১১ এএম ১২
৬৪ জেলার প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতায় তৈরি ‘জাতীয় যুব জলবায়ু অবস্থানপত্র’

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাস্তবতা ও দাবিগুলো জাতীয় নীতিতে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শতাধিক তরুণ জলবায়ুকর্মী। তুরস্কে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ (COP31) সামনে রেখে তাঁরা ২০ দফা ‘যুব জলবায়ু অবস্থানপত্র ২০২৬’ প্রকাশ করেছেন।

৬৪ জেলার তরুণদের দাবি এবং জলবায়ুঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের সরাসরি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি এই অবস্থানপত্র পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি মিলনায়তনে একশনএইড বাংলাদেশ ও ব্রাইটার্স আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে অবস্থানপত্রটি প্রকাশ ও হস্তান্তর করা হয়।

অবস্থানপত্রে জলবায়ু প্রশমন, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অভিযোজন, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি ও ন্যায়সংগত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ুশিক্ষা ও সচেতনতা, জেন্ডারসমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নীতিনির্ধারণে তরুণদের নেতৃত্ব—এই সাতটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘প্যারিস থেকে আনতালিয়া: এক দশকের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’।

৬৪ জেলার তরুণদের মতামত

অবস্থানপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় দেশের ৬৪ জেলার তরুণদের পাশাপাশি জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া হয়। ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, গল্প বলার আসর, অংশগ্রহণমূলক মানচিত্রায়ন ও কমিউনিটি স্কোরকার্ডের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এ ছাড়া সাতটি নির্দিষ্ট সংকটাপন্ন এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা এবং ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ ক্লাস্টারে তিন বছর ধরে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলও অবস্থানপত্র তৈরিতে বিবেচনা করা হয়েছে।

সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ‘ফেসিং দ্য ফ্রন্টলাইনার্স: সিএসও অ্যান্ড এক্সপার্টস’ শীর্ষক আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সিসিজে-বির পরিচালক এম হাফিজুল ইসলাম খান, সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, ইউএনডিপির শারমিন ইসলাম, ইউএন উইমেনের দিলরুবা শারমিন এবং প্রান্তিক এলাকার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

তরুণদের কণ্ঠে জলবায়ুর প্রভাব

‘চিলড্রেনস ভয়েস অন ক্লাইমেট’ শীর্ষক আলোচনায় পথশিশু ও হ্যাপি হোমসের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে।

এ ছাড়া ‘ক্লাইমেট পলিসি নেগোশিয়েশন ফেলোশিপ’-এর ১৯ জন তরুণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আদলে একটি মক নেগোশিয়েশনে অংশ নেন। সেখানে ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায়সংগত রূপান্তর এবং কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়।

‘ইন কনভারসেশন উইথ ডিপ্লোম্যাটস’ পর্বে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা তরুণদের তৈরি অবস্থানপত্র পর্যালোচনা করেন। এ সময় জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

তরুণদের বড় ভূমিকা দেখছেন নীতিনির্ধারকেরা

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, বৈশ্বিক ও সর্বগ্রাসী জলবায়ু সংকট শুধু সরকারের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ রক্ষায় তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। দূষণ চিহ্নিত করা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় রোধ, জলবায়ুঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (জলবায়ু, পরিবেশ ও আন্তঃমীমাংসা পানিসম্পদ অনুবিভাগ) কাজী এহসানুল হক বলেন, জলবায়ু বিষয়ে নেওয়া বর্তমান সিদ্ধান্তগুলো তরুণদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। তাই জলবায়ুনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুজান রাইল বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া ও বাস্তুচ্যুতির কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মানুষ ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার। কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য সরকার, স্থানীয় কমিউনিটি, তরুণ সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ডেনিশ দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন অ্যান্ডার্স বি. কার্লসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সীমানা নেই। স্থানীয় কমিউনিটি থেকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারক—সবার যৌথ প্রচেষ্টায় নীতিনির্ধারণ ও স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করা প্রয়োজন।

মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনীন রশিদ বলেন, জলবায়ু পদক্ষেপের কেন্দ্রে তরুণদের রাখা জরুরি। কারণ আজকের সিদ্ধান্তই তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

দ্বীপাঞ্চলের বাস্তবতা তুলে ধরলেন তরুণ প্রতিনিধি

নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে আসা প্রান্তিক যুব প্রতিনিধি নিজাম উদ্দিন বলেন, ঝড় ও জলাবদ্ধতার কারণে দ্বীপাঞ্চলের মানুষ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে যাতায়াত ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়, যা অন্তঃসত্ত্বা নারী ও জরুরি রোগীদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে মৌলিক সেবা ও স্থানীয় সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরের সঞ্চালনায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের দাবিগুলো তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সমাপনী অধিবেশনে তরুণদের পক্ষ থেকে ব্রাইটার্সের চেয়ারপারসন ফারিহা অমি ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ পজিশন ২০২৬’ উপস্থাপন করেন। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থানপত্রটি গ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে আয়োজকেরা জানান, গৃহীত সুপারিশগুলো কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি নীতিমালার অংশ হিসেবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ১৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ প্লাজা থেকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ পর্যন্ত পদযাত্রার মধ্য দিয়ে চার দিনের ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২৬’ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ সেপ্টেম্বর বিষয়ভিত্তিক আলোচনা এবং ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অনলাইন আলোচনা বা ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার মূল ও সমাপনী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি হয়।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!