নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হচ্ছে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা

আপডেট: সেপ্টে ২৬, ২০২৬ : ০৫:৩৩ পিএম ৬ ০
ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হচ্ছে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা

দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউজিসি দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ম্যান্ডারিন (চীনা), জাপানিজ, জার্মান, কোরিয়ান ও আরবিসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একাধিক ভাষায় দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি ভাষা শিখলে তাঁদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিভাগীয় পর্যায়ে স্থাপন করা হবে ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র
ইউজিসি সদস্য জানান, দেশের সব বিভাগীয় অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে এসব কেন্দ্র পরিচালনার জন্য বিদেশি ও স্থানীয় ভাষা বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে ইউজিসি কাজ করবে। বিশেষ করে ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে চীনের দূতাবাসের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভাষা শিক্ষা থেকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ
তৃতীয় ভাষা শিক্ষার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের সম্পর্ক তুলে ধরে অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বিদেশি ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, বৃত্তি, যৌথ একাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা ফেলোশিপ ও সামার স্কুলে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং শিক্ষক-গবেষক বিনিময় কর্মসূচিতেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশকে উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ লক্ষ্যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ ও দ্বৈত ডিগ্রি চালুর বিষয়ে কাজ করছে ইউজিসি।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভাষা দক্ষতায় বাড়তে পারে কর্মসংস্থানের সুযোগ
বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তৃতির বিষয়টি উল্লেখ করে ইউজিসি সদস্য বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা রয়েছে।
এসব খাতে কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ বিষয়ে দক্ষতার পাশাপাশি বিদেশি ভাষা ও আন্তসাংস্কৃতিক যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা শুধু ভাষা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বাড়ানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতা বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ইউজিসি সদস্য। তাঁর মতে, দুই দেশের একাডেমিক সহযোগিতা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদীয়মান প্রযুক্তি, কৃষি, জলবায়ু, প্রকৌশল, জীবপ্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এ ধরনের সহযোগিতা জোরদারে প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়, যৌথ গবেষণা, বৃত্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা ভাষা শেখার সুযোগ সহজলভ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ব্রেইন ড্রেইন নয়, গুরুত্ব দিতে হবে ব্রেইন সার্কুলেশনে
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন।
তিনি বলেন, শুধু মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেইন নিয়ে চিন্তা না করে ব্রেইন সার্কুলেশনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনা ছাড়াও তাঁদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এ জন্য ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, সামার স্কুল, যৌথ গবেষণা তত্ত্বাবধান, গবেষণা সহযোগিতা ও একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্ঞান নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংযোগ বাড়বে।
ভাষা হতে পারে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সেতু
বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে ইউজিসি সদস্য বলেন, একটি ভাষা অন্য একটি সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারা বোঝার প্রবেশদ্বার।
কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা চীনা ভাষার পাশাপাশি দেশটির ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন। একইভাবে চীনা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদের বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটকে শুধু ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
তাঁর মতে, ভাষা শিক্ষার সঙ্গে উচ্চশিক্ষা, উচ্চশিক্ষার সঙ্গে গবেষণা, গবেষণার সঙ্গে উদ্ভাবন এবং দক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইউনান প্রাদেশিক কমিটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ঝাও জুনমিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান, ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি কমিটির সম্পাদক রুয়ান চাওছি এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ।


আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!