যুবসমাজকে শিক্ষিত, দক্ষ ও কর্মমুখী করে রাষ্ট্র গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলকে শক্তিশালী ও আদর্শভিত্তিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে চান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন।
এ জন্য তরুণদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি সংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
আগামীকাল ২৭ অক্টোবর যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন নুরুল ইসলাম নয়ন। সাক্ষাৎকারে যুবদলের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, তরুণদের কর্মসংস্থান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহত নেতাকর্মীদের পরিবারের সহায়তা, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন তিনি।
নয়ন বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুবসমাজকে ঘিরে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং তরুণদের একটি অংশ অপরাধ ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতি থেকে যুবসমাজকে বের করে রাষ্ট্র গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যুবদল প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর মতে, যুবকদের শক্তি, সাহস, মেধা, মনন ও গবেষণার ওপর সভ্যতার বিকাশ নির্ভর করে। কোনো দেশকে উন্নত করতে হলে যুবসমাজকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়। তরুণদের প্রতি নেতিবাচক ধারণা দূর করে ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে যুবদল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব
যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সংগঠনটির বিস্তৃত কর্মী বাহিনী রয়েছে। গত ১৬ থেকে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামেও যুবদলের নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তবে যুবসমাজকে রাষ্ট্র গঠনের কাজে প্রত্যাশিত মাত্রায় সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
দেশের তরুণদের একটি বড় অংশ বেকারত্বের চ্যালেঞ্জে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা, স্টার্টআপ কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়া এবং কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের উপযোগী জনশক্তি গড়ে তোলার কথাও বলেন।
নয়ন বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। তরুণদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সরকার উদ্যোগী হলে যুবদলও সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে চায়।
বিদেশে যেতে আগ্রহী তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাঁদের বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে সহায়তা করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার মধ্যে থাকা তরুণেরা যেন যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পেতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যুবদলের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে সাধারণ সম্পাদক বলেন, শিক্ষিত তরুণদের সংগঠনে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশার কারণে কাউকে সংগঠনের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। উচ্চশিক্ষিত তরুণের পাশাপাশি গাড়িচালক, দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও যুবদলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তরুণদের শিক্ষিত ও দক্ষ হতে হবে। যুবদলকে এমন একটি সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যেখানে তরুণেরা নিরাপদ পরিবেশে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার পথ খুঁজে পাবেন।
হতাহত নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি গত ১৬ থেকে ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে হামলা, মামলা ও হত্যার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, সব পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কোনো পরিবার অসহায় অবস্থায় রয়েছে বলে খবর পেলে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশাপাশি আহত ও অসুস্থ নেতাকর্মীদেরও সহায়তা করা হয়েছে। ক্যানসারে আক্রান্ত অনেক নেতাকর্মীকে চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সহায়তা করা হয়েছে।
কোনো পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে মাসিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, সংগঠনের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সবার জন্য সমানভাবে সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ভবিষ্যতে সরকারের মাধ্যমে এসব পরিবারকে আরও সহায়তা করা যায় কি না, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের সরকারি কার্যক্রমে যুক্ত করা বা তাঁদের জন্য বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে যুবদলের দাবি রয়েছে জানিয়ে নয়ন বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব উদ্যোগ কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে যা বললেন নয়ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ও নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়ে নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুবদলের নাম জড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কখনো অভিযোগ এসেছে, যাঁরা বর্তমানে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন।
তাঁর দাবি, কোনো কোনো ঘটনায় ব্যক্তিগত বিরোধ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। গত ১৬ থেকে ১৭ বছরে সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা কার্যালয় দখল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরে সেগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে কেউ কেউ বিরোধ ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন বলে তিনি মনে করেন।
নয়ন বলেন, যুবদল একটি শক্তিশালী সংগঠন। এখান থেকে উঠে আসা অনেক নেতা বর্তমানে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী নির্বাচনেও যুবদলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে তাঁর ধারণা।
তিনি বলেন, সংগঠনের এক হাজার নেতাকর্মীর ভালো কাজ যেন একজন বিপথগামী নেতার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে বিষয়ে তাঁরা আন্তরিক। এ কারণে অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, সততা, মেধা, যোগ্যতা ও সাহসের ভিত্তিতে যুবদলকে একটি শক্তিশালী আদর্শভিত্তিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য।
নেতৃত্ব নির্বাচনে সিভি ও সাক্ষাৎকার
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, প্রার্থীদের সাংগঠনিক পথচলা ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা যাচাই করে নেতৃত্ব নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্তে (সিভি) পদ-পদবি, আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান এবং মামলার সংখ্যা উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। এসব তথ্যের পাশাপাশি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রার্থীদের সাংগঠনিক নিষ্ঠা ও ত্যাগ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শুধু ঘরে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিটি গঠন করতে চান না তাঁরা। যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চান, যাতে সংগঠনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীরা বঞ্চিত না হন।
সিভি সংগ্রহ ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রার্থীদের মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই এ প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য।
মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চায় যুবদল
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যুবদলের নেতাকর্মী ও দেশের তরুণদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, গত ১৬ থেকে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ বলেছিলেন। নির্বাচনের আগে তাঁর পরিকল্পনা ইশতেহারে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলা এবং একটি মানবিক রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
নয়ন বলেন, তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান, যেখানে প্রতিহিংসার স্থান থাকবে না। বিএনপির সঙ্গে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের কাছে যেমন দেশ নিরাপদ থাকবে, তেমনি বিএনপির সঙ্গে যাঁরা নেই, তাঁদের কাছেও বাংলাদেশ সমানভাবে নিরাপদ থাকবে।
নতুন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারকে সহযোগিতা করতে চায় যুবদল। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে যুবসমাজের শক্তি, মেধা ও কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চান তাঁরা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!