বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো গেলে নদীগুলো আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।
আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জাতীয় পানিসম্পদ সুরক্ষায় পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা গেলে পদ্মার শাখা-উপশাখাসহ অন্যান্য নদীতে পানির প্রবাহ বাড়বে। এতে কৃষি সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
নদীতে পানির প্রবাহ কমছে
পদ্মা ও তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে রুহুল কবির রিজভী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। এমনকি বর্ষা মৌসুমেও নদীর বিভিন্ন অংশে পানির স্বল্পতা দেখা যায়। তিস্তা ও যমুনা নদীর ওপর সেতু দিয়ে যাতায়াতের সময় নদীর মধ্যে চর দেখা যায়।
তিনি বলেন, পদ্মার শাখা ও উপনদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সমুদ্র থেকে আসা লবণাক্ত পানিকে ঠেলে সমুদ্রের দিকে পাঠানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফারাক্কার প্রভাবে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ছে।
রিজভীর দাবি, গত ২০ থেকে ২৫ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ৩০ শতাংশ কমেছে। ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাব এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো অবস্থানের আহ্বান
ফারাক্কা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে পানির হিস্যা নিশ্চিত করার জন্য গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে তা বাদ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আরও জোরালো অবস্থান নিতে হবে।
তিনি বলেন, এ জন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধের উদাহরণ তুলে ধরে রিজভী বলেন, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর পানি বণ্টন নিয়েও বিরোধ রয়েছে। পানির হিস্যার প্রশ্নে কোনো পক্ষই সহজে ছাড় দিতে চায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন।
পানি সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিবেশগত প্রভাব তুলে ধরে রিজভী বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আর্সেনিকের সমস্যা এবং পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপের ফলে পরিবেশের নানা ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, পানিবিজ্ঞানী বি. এম. আব্বাস তাঁর ‘গঙ্গেস ওয়াটার ডিসপিউট’ বইয়ে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্যও পদ্মার ওপর বাঁধ নির্মাণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ এবং শাখা-উপনদীগুলোতে পানির প্রবাহ বজায় রাখা গেলে নদীগুলো আবারও সচল হবে। এতে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগের উন্নয়ন সম্ভব হবে।
নদীকেন্দ্রিক বাংলার ঐতিহ্যবাহী সাম্পান ও পানসি নৌকার চলাচল আবারও দেখা যেতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিস্তাপারের মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরলেন দুলু
গোলটেবিল বৈঠকের বিশেষ অতিথি আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার। একসময় এসব এলাকায় সব ধরনের ফসল উৎপাদিত হতো। কিন্তু বর্তমানে পানির সংকট ও নদীর পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এ অঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
তিস্তাকে ঘিরে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি, তিস্তা নদী সুরক্ষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশি প্রফেশনালস যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও সেলিম রেজা হাবিব।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মো. আনোয়ার কাদির এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. রুহুল আমিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মেহেদী হাসান পলাশ।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!