কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যারিস্টার, কেউ চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। কারও বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ কোটিপতি ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকের সন্তান। মেধা, শিক্ষা ও সম্ভাবনায় এগিয়ে থাকা এসব তরুণ-তরুণীর অনেকের ভবিষ্যৎ এখন মাদকের কারণে থমকে গেছে।
রাজধানীর কয়েকটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীদের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে রয়েছেন উচ্চবিত্ত ও ভিআইপি-সিআইপি পরিবারের সন্তান, প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া তরুণ-তরুণী।
কারও বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরার পর মাদকাসক্তি বেড়েছে, কেউ আবার প্রতিষ্ঠিত পেশায় থেকেও নেশার কারণে কর্মজীবন হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে অনেকে মানসিক ও শারীরিক নানা জটিলতায়ও ভুগছেন।
বিদেশফেরত ব্যারিস্টার, চিকিৎসাশিক্ষার্থীও মাদকে
রাজধানীর উত্তরার একটি অভিজাত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চলতি মাসে ২৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একটি শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার ও এফবিসিসিআইয়ের একজন পরিচালকও রয়েছেন। অ্যালকোহল ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে তিনি সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
একই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ২৬ বছর বয়সী এক তরুণী। ধনাঢ্য পরিবারের এই তরুণী সম্প্রতি লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু মাদকাসক্তির কারণে আইন পেশায় যুক্ত হতে পারেননি। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করেন।
মাদকাসক্তির কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনাও থেমে গেছে এক তরুণের। চীনে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে মাদকে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে তাঁর মানসিক ভারসাম্যেও সমস্যা দেখা দেয়। পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরতে হয় তাঁকে। দেশে ফেরার পরও নেশা ছাড়তে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।
ইউরোপের একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নেওয়া এক প্রকৌশলীও মাদকাসক্তির কারণে গুরুতর সমস্যায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের সময় ফেনসিডিল, কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হন তিনি। দীর্ঘদিনের মাদক সেবনে তাঁর শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান
রাজধানীর একটি কলেজের শিক্ষার্থীও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।
গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে পাস করা এক প্রকৌশলীও গাঁজায় আসক্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন তিনি। মাদকের কারণে তাঁর পেশাজীবনও থেমে গেছে।
ইয়াবায় আসক্ত আরেক তরুণের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দম্পতির এই সন্তানকে নিয়ে পুরো পরিবার বিপর্যস্ত। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক যুবকও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশটির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি মাদকে জড়িয়ে পড়েন। পরে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ধানমণ্ডির শুক্রাবাদ এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে একাধিকবার চিকিৎসা নেওয়া হলেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। দীর্ঘদিনের মাদক সেবনে তাঁর শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর একটি নামকরা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের মালিকের একমাত্র ছেলেও মাদকাসক্ত। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তাঁর মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সিজোফ্রেনিয়াসহ গুরুতর মানসিক জটিলতার চিকিৎসা চলছে।
একাকিত্ব থেকেও মাদকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ
এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীও দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতা থেকে মাদকে জড়িয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়া এবং পরে দাম্পত্য কলহের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তাঁর। একপর্যায়ে নিঃসঙ্গতা থেকে মাদক গ্রহণ শুরু করেন। বর্তমানে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি হলেও ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার জন।
পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়াও কারণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, একাকিত্ব, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অঢেল অর্থবিত্তের কারণে অনেকে মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। শিক্ষার অভাব ও মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু চিকিৎসার আওতায় আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে চিকিৎসার পরও আবার মাদকে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!