রাজধানীর দক্ষিণ অংশকে আধুনিক, যানজটমুক্ত, সবুজ ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল, কাঁচপুরে বাস টার্মিনাল উন্নয়ন, ধানমন্ডি লেকের পরিবেশগত উন্নয়ন ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণকে এবারের পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বাসসকে বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশের ভারসাম্য, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ও নগরের নান্দনিকতা নিশ্চিত করে দক্ষিণ ঢাকাকে ‘স্মার্ট ও গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তাঁরা।
অবকাঠামো উন্নয়নে ৮০৬ কোটি টাকা
ডিএসসিসির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়ন খাতে মোট ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৯৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরে ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নে ৮০৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ৭২৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এবার মূল বরাদ্দের তুলনায় ৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বেশি রাখা হয়েছে।
নিজস্ব অর্থায়নের বড় অংশ ব্যয় হবে সড়ক ও মহাসড়ক খাতে। এ খাতে এবার ৫২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২২ মোড়ে এআই ট্রাফিক সিগন্যাল
এবারের পরিকল্পনায় প্রচলিত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির ২২টি ইন্টারসেকশনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। যানবাহনের চাপ ও চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করে এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল পরিচালনা করা গেলে যানজট কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর সময়ও সাশ্রয় হবে।
কাঁচপুরে বাস টার্মিনাল
নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় উদ্যোগ হলো সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের প্রস্তুতি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাঁচপুর বাস টার্মিনালের প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, শেড, টিকিট কাউন্টার ও টয়লেট নির্মাণে চলতি অর্থবছরে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, আন্তজেলা বাস টার্মিনালের কার্যক্রম কাঁচপুরে স্থানান্তর করা গেলে রাজধানীর ভেতরে দূরপাল্লার বাসের প্রবেশ ও চলাচল কমবে। এতে নগরের অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহনের চাপও কমবে।
ধানমন্ডি লেকের উন্নয়নে ৪৫ কোটি টাকা
নগরের পরিবেশ ও নাগরিক বিনোদনের বিষয়টিও এবারের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ধানমন্ডি লেকের অবকাঠামো ও পরিবেশগত উন্নয়ন এবং সৌন্দর্যবর্ধনে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, নগর উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তা ও ভবন নির্মাণ বোঝায় না। নাগরিকদের হাঁটাচলা, বিনোদন ও নির্মল পরিবেশ পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণে ধানমন্ডি লেকসহ নগরের উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৃক্ষরোপণে ৭ কোটি টাকা
‘স্মার্ট ঢাকা’র পাশাপাশি ‘গ্রিন ঢাকা’ গড়ার পরিকল্পনাতেও গুরুত্ব দিয়েছে ডিএসসিসি। চলতি অর্থবছরে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন খাতে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘জিরো সয়েল’ কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন সড়কের মিডিয়ানে গাছ ও ঘাস লাগানো হয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন মিডিয়ান ইজারা দিয়ে সেখানে নান্দনিক গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব নার্সারিতে ২০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্য
বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে টেকসই করতে ওসমানী উদ্যানে ডিএসসিসির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একটি স্থায়ী নার্সারি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের প্রায় ১ হাজার ৪০০টি গাছের চারা সংগ্রহ করা হয়েছে।
আগামী বছর এই নার্সারি থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
নগর ভবনের দক্ষিণ পাশেও আরও একটি নার্সারি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে ভবিষ্যতে ডিএসসিসির নিজস্ব নার্সারি থেকেই নগরের বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণের জন্য প্রয়োজনীয় চারা সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
আব্দুস সালাম বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণকে সবুজ করতে শুধু বড় বড় প্রকল্প নিলেই হবে না; সড়কের মিডিয়ান, পার্ক, খোলা জায়গা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাতে হবে। এজন্য নিজস্ব নার্সারি গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
‘উন্নয়নের লক্ষ্য হবে মানুষের জীবন সহজ করা’
ডিএসসিসির প্রশাসক বলেন, এমন একটি ঢাকা গড়ে তুলতে চান, যেখানে উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান, যোগাযোগ হবে আধুনিক, পরিবেশ থাকবে সবুজ এবং নাগরিকেরা স্বস্তির সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক, ফুটপাত, পার্ক, লেক কিংবা সবুজায়নের অবকাঠামো রক্ষায় নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
আব্দুস সালাম বলেন, ‘উন্নয়নের লক্ষ্য হবে মানুষের জীবনকে সহজ করা। সেই লক্ষ্যেই সড়ক থেকে ট্রাফিক, পরিবেশ থেকে বিনোদন—সব ক্ষেত্রকে সমন্বিত করে কাজ করা হচ্ছে।’
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!