দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার ফলে দেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, সুষম পুষ্টি এবং নিয়মিত শরীরচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘Health & Wellness Seminar-2026: The Science of Lifelong Health: Nutrition and Lifestyle’ শীর্ষক সেমিনার।
রোববার (৫ জুলাই) বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দফতরের পুরাতন ভবনের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী, আইইবির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইইবির প্রেসিডেন্ট এবং রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ফাস্টফুড, প্রসেসড খাবার এবং চিনিযুক্ত কোমল পানীয় গ্রহণের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান থাকায় দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি বলেন, সুস্থ শরীর ছাড়া কর্মদক্ষতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। একজন প্রকৌশলী দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইইবি প্রকৌশলীদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের সার্বিক কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে দেশের ১৮টি কেন্দ্র, ৩৪টি উপকেন্দ্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৪টি ওভারসিজ চ্যাপ্টারের মাধ্যমে সংগঠনটি সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার ও পেশাগত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষ প্রকৌশলী গড়ে তুলতে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন। সেই উপলব্ধি থেকেই আইইবি প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক এই বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করেছে, যাতে সদস্যরা স্বাস্থ্যকর জীবনধারা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা লাভ করতে পারেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. মো. মজিবুল হক, যিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়োলজিক্স–কোয়ান্টাম সেলুলার মেডিসিন (QCM)-এর মেডিকেল কনসালটেন্ট ও ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ম্যানেজার এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক।
তিনি তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, সুস্বাস্থ্য বলতে কেবল রোগ না থাকাকে বোঝায় না; বরং এটি শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণের মাধ্যমে এসব অসংক্রামক রোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাজা শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার, পরিমিত আমিষ এবং পর্যাপ্ত পানি রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ফাস্টিং বা উপবাস প্রসঙ্গে ড. মজিবুল হক বলেন, এটি বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনের অংশ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। সঠিক নিয়মে এবং উপযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফাস্টিং শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম উন্নত করতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ সময় উপবাসে যাওয়ার বিষয়ে তিনি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর জীবনের অন্যতম ভিত্তি হলো নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং বা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে, মানসিক চাপ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ঘুমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আধুনিক ব্যস্ত জীবনে অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী প্রকৌশলীরা বক্তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ফাস্টিং, ওজন নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং কর্মব্যস্ত জীবনে সুস্থ থাকার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উত্তর দেন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক এ ধরনের আয়োজন প্রকৌশলীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করবে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক তাঁর তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং গবেষণালব্ধ উপস্থাপনার মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছেন।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন আইইবির সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস-প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ.টি.এম. তানবীর-উল হসান (তমাল), আইইবি ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন তালুকদার, সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী কে. এম. আসাদুজ্জামান, ভাইস-চেয়ারম্যান (একাডেমিক অ্যান্ড এইচআরডি) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের নেতৃবৃন্দ, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রকৌশল সংগঠনের সদস্যরা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্য সচেতনতা শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও উন্নয়নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সচেতন খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ইতিবাচক জীবনধারা অনুসরণের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।
No comments yet. Be the first to comment!