স্বাস্থ্য

ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে দ্রুত শনাক্তকরণই সবচেয়ে জরুরি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

আপডেট: জুলা ২৩, ২০২৬ : ০৪:৪৭ এএম ১৯
ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে দ্রুত শনাক্তকরণই সবচেয়ে জরুরি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট টিবি বা ডিআর-টিবি) এখন আধুনিক চিকিৎসায় কার্যকরভাবে নিরাময়যোগ্য। তবে রোগ শনাক্তে বিলম্ব, চিকিৎসায় অনিয়ম, সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাব এখনও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের বড় বাধা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, দ্রুত রোগ শনাক্ত করে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিয়মিত চিকিৎসা সম্পন্ন করাই ডিআর-টিবি থেকে সুস্থ হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

শ্বাসতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দেওয়ান আজমল হোসেন বলেন, ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মার চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশে এ রোগের চিকিৎসা-সফলতার হার ৯০ শতাংশের বেশি।

তিনি জানান, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বিপিএএল (BPaL) ও বিপিএএলএম (BPaLM) পদ্ধতির স্বল্পমেয়াদি, সম্পূর্ণ মুখে খাওয়ার ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

অধ্যাপক আজমল বলেন, দেশে ৪৬০টিরও বেশি উপজেলায় জিনএক্সপার্ট পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক রোগী সময়মতো পরীক্ষা করান না কিংবা রোগ নির্ণয়ের পরও চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন।

তিনি বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবনের পরও যদি রোগীর শারীরিক শক্তি ও ক্ষুধা ফিরে না আসে, তাহলে ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইডিসিএইচ) সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা (সেতু) বলেন, দুই থেকে তিন মাস নিয়মিত চিকিৎসার পরও কাশি, জ্বর, ওজন কমা বা কফে জীবাণু থাকার মতো উপসর্গ অব্যাহত থাকলে ডিআর-টিবি সন্দেহ করা উচিত।

তিনি জানান, আগে এই রোগের চিকিৎসা ১৮ থেকে ২৪ মাস চলত এবং প্রতিদিন ইনজেকশন নিতে হতো। এখন আধুনিক ওষুধ বেডাকুইলিন ও প্রিটোমানিডের সমন্বয়ে ছয় থেকে নয় মাসের মুখে খাওয়ার ওষুধেই অধিকাংশ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

ডা. শারমিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, এতে যক্ষ্মার জীবাণু আরও শক্তিশালী হয়ে ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, নির্ধারিত চিকিৎসা যথাযথভাবে অনুসরণ করলে রোগীদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সুস্থ হয়ে ওঠেন। আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডিআর-টিবির সব ওষুধ সরকার বিনামূল্যে সরবরাহ করছে বলেও জানান তিনি।

আইসিডিডিআর,বি ও এনআইডিসিএইচের জ্যেষ্ঠ মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মো. শিরাজুল ইসলাম (সুমন) বলেন, ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা মূলত মানুষের অসচেতনতার ফল। অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, অনিয়মিত ওষুধ সেবন এবং নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারের কারণে জীবাণু ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে।

তিনি বলেন, অনেক রোগী সামান্য সুস্থ বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। এতে শরীরে থেকে যাওয়া জীবাণু আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।

ডা. সুমন আরও বলেন, ডিআর-টিবি অত্যন্ত সংক্রামক। তাই মাস্ক ব্যবহার, কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং রোগীকে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন কক্ষে রাখার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীর পুষ্টিকর খাদ্য ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজ্ঞান ইতোমধ্যে ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মার কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করেছে। এখন এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ নিশ্চিত করা।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!