চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে দূরত্ব ও যাতায়াতের বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেছেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের অবস্থান, যাতায়াতের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা ও দুর্গমতার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে এই ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। দেশের বিভিন্ন জেলার দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকে এ উদ্যোগের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রোববার রংপুরের পিটিআই অডিটোরিয়ামে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো জরুরি। অঞ্চলভেদে বিদ্যমান বৈষম্য কমাতেও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করে ভাতা
দুর্গম ভাতা প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, কোন কোন এলাকা প্রকৃত অর্থে দুর্গম হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সেখানে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তারা কী ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন, তা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করার বিষয়ে কর্মশালায় আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের মতামত ও সুপারিশ লিখিতভাবে সংকলন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এর ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক সংস্কারে জোর
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা স্পষ্ট করে কার্যকর নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শুধু পদসোপান থাকলেই হবে না, প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবস্থার প্রতিও দায়বদ্ধ থাকতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রশাসনের এক স্তরের কাজ যেন অন্য স্তরের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। বিভাগ থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত কর্মশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সব কার্যক্রমের চূড়ান্ত গন্তব্য বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ। তাই প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল সরাসরি শিশুদের শেখার পরিবেশে দৃশ্যমান হতে হবে।
আগামী বছর ‘সায়েন্স টয়’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগামী বছর পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ‘সায়েন্স টয়’ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, খেলাধুলা ও হাতে-কলমে শেখার মাধ্যমে শিশুদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে প্রাথমিকের নতুন কারিকুলামে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে আটটি ক্রীড়া কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়িয়ে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান নয়
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান পরিচালনার প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি ও শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক শিক্ষককে নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, মানসম্মত ও বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব ও কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নৈতিক শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ক্যারিয়ারমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী, পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ কামরুল হাসান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ইসরাত জাহান।
এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা রংপুর বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক, বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট, ইউপিটিসি ইন্সট্রাক্টরসহ প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!