শিক্ষা

শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার বই, গুরুত্ব পাবে হাতে-কলমে শেখা

আপডেট: অক্টো ২৪, ২০২৬ : ০৫:৪৪ এএম ১ ০
শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার বই, গুরুত্ব পাবে হাতে-কলমে শেখা

মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শেখার সুযোগ তৈরি করতে নতুন চারটি পাঠ্যবই যুক্ত হচ্ছে দেশের শিক্ষাক্রমে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এতে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আনন্দময় শিখন এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন বইগুলো হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। বইগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তা এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, বইগুলোর পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। আগামীকাল ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় এগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে মুদ্রণের জন্য পাণ্ডুলিপি ছাপাখানায় পাঠানো হবে। সব মিলিয়ে চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে মুদ্রণকাজ শেষ করার আশা করছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে আরও আনন্দময় ও জীবনমুখী করার পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই নতুন বইগুলোর মূল লক্ষ্য। গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর প্রাথমিক রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের পরামর্শের ভিত্তিতে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ জীবন ও আত্মরক্ষার শিক্ষা

চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি সাজানো হয়েছে ১৪টি অধ্যায়ে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষার কৌশলও শেখানো হবে।

খেলাধুলার সময় আঘাত পাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা বাস্তবসম্মত ছবি ও নির্দেশনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার, আঘাত প্রতিরোধ, পুষ্টি এবং সামাজিক দক্ষতা সম্পর্কেও জানার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা।

বইটিতে রয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের অনুপ্রেরণামূলক গল্প। আয়মান স্যার ও সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সামাজিক বাধা অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের কাহিনির মাধ্যমে খেলাধুলার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে খেলাধুলাকে শুধু শরীরচর্চা নয়, বরং পেশা ও সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবেও দেখানো হয়েছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর হয়ে না ওঠে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়

চতুর্থ শ্রেণির আরেকটি নতুন বই ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। ১১টি অধ্যায়ে সাজানো বইটিতে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠা-পুলির মতো পরিচিত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের পাশাপাশি পারিবারিক জীবন ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও রাখা হয়েছে বইটিতে।

এতে বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। শিশুদের নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও বইটির উদ্দেশ্য।

বইটির একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে আয়োজনটির সূচনা এবং এর বিজয়ীদের দুর্লভ ছবিও যুক্ত করা হয়েছে।

পড়াশোনা হবে আনন্দময়, কমবে পরীক্ষার ভয়

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণীত ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটির মূল লক্ষ্য পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলা। ছয়টি অধ্যায়ে সাজানো বইটিতে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ পাবে।

এতে শেখাকে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা তথ্য মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যভার কমানোর পাশাপাশি শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কারিগরি শিক্ষায় হাতে-কলমে দক্ষতা

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি সাজানো হয়েছে আটটি অধ্যায়ে। এর মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাস্তব জীবনে কাজে লাগে—এমন দক্ষতা গড়ে তোলা।

বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি, নতুন বিশ্ব, ক্ষুদ্র উদ্যোগের সম্ভাবনা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলোর মৌলিক সমাধান খোঁজার ধারণা পাবে। অর্থাৎ শুধু কী জানা আছে, তার পরিবর্তে শিক্ষার্থী কী করতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন চারটি বইয়ে শব্দকোষের মতো বিশেষ অংশও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।

ধাপে ধাপে বাড়বে নতুন বইয়ের পরিধি

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বাসসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন বইগুলো সেই পরিকল্পনার অংশ।

তিনি জানান, চতুর্থ শ্রেণিতে চালু হতে যাওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, চারটি বই মুদ্রণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদন পাওয়ার পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই ছাপানোর কাজ শেষ করার আশা করছেন তাঁরা।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন পাঠ্যপুস্তকগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

নতুন বইগুলো চালুর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতায় কতটা পরিবর্তন আসে, তা নির্ভর করবে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে এর যথাযথ প্রয়োগ, শিক্ষকদের প্রস্তুতি এবং হাতে-কলমে শেখার প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!