ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম সবার ওপরের দিকেই থাকবে। ব্রাজিলের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন পেলে। আর ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
অথচ ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর কখনো জেতা হয়নি এই দুই কিংবদন্তির। এর পেছনে তাঁদের পারফরম্যান্সের ঘাটতি নয়, বরং পুরস্কারটির তৎকালীন নিয়মই ছিল প্রধান কারণ।
১৯৫৬ সালে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ব্যালন ডি’অর চালু করে। শুরুতে এই পুরস্কার কেবল ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য নির্ধারিত ছিল, যাঁরা ইউরোপের ক্লাবগুলোতে খেলতেন। ফলে দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের ফুটবলাররা অসাধারণ পারফরম্যান্স করলেও পুরস্কারটির জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পেতেন না।
ইউরোপের বাইরে খেলায় বঞ্চিত পেলে
পেলে তাঁর ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসে খেলেছেন। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপের বাইরে খেলার কারণে ব্যালন ডি’অরের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না তাঁর।
১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ জিতলেও এই পুরস্কার অধরাই থেকে যায় পেলের। তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বও তৎকালীন নিয়মের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেনি।
বিশ্বকাপ জিতেও পুরস্কারের দৌড়ে ছিলেন না ম্যারাডোনা
আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বার্সেলোনা ও নাপোলির মতো ইউরোপের বড় ক্লাবে খেলেছেন। কিন্তু সে সময় ব্যালন ডি’অরের যোগ্যতা নির্ধারণে ইউরোপীয় নাগরিকত্বের শর্ত থাকায় আর্জেন্টাইন এই তারকা পুরস্কারটির জন্য বিবেচিত হতে পারেননি।
১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতে। পুরো আসরে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়। কিন্তু বিশ্বকাপজয়ী দলের এই অধিনায়কও ব্যালন ডি’অরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি।
কখন বদলানো হয় নিয়ম?
১৯৯৫ সালে ব্যালন ডি’অরের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনা হয়। তখন থেকে ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান।
নতুন নিয়মের সুবিধা নিয়ে ওই বছর ব্যালন ডি’অর জেতেন লাইবেরিয়ার স্ট্রাইকার জর্জ উইয়াহ। তিনি ছিলেন পুরস্কারটির প্রথম অ-ইউরোপীয় বিজয়ী।
এরপর ২০০৭ সালে নিয়ম আরও সম্প্রসারিত করা হয়। তখন থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশের ফুটবলার, যেকোনো লিগে খেললেও ব্যালন ডি’অরের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান।
তবে তত দিনে পেলে ও ম্যারাডোনা দুজনই খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেছেন। ফলে নিয়ম পরিবর্তনের পরও তাঁদের প্রতিযোগিতামূলকভাবে ব্যালন ডি’অর জেতার সুযোগ তৈরি হয়নি।
সম্মাননা পেয়েছেন দুজনই
প্রতিযোগিতামূলক ব্যালন ডি’অর না জিতলেও ফুটবলে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন পেলে ও ম্যারাডোনা।
১৯৯৫ সালে ম্যারাডোনাকে সম্মানসূচক ব্যালন ডি’অর দেওয়া হয়। পরে ২০১৩ সালে পেলেকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ফিফা ব্যালন ডি’অর। তবে এসব সম্মাননা নিয়মিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পাওয়া পুরস্কার থেকে আলাদা।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি আটবার এবং পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন।
পেলে ও ম্যারাডোনার ব্যালন ডি’অর না জেতার ইতিহাস তাই ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। কোনো খেলোয়াড়ের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু ব্যক্তিগত পুরস্কারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। মাঠের পারফরম্যান্স, দলকে সাফল্য এনে দেওয়া এবং ফুটবলপ্রেমীদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়াও একজন খেলোয়াড়ের উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!