আইন-আদালত

হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি বেড়েছে, বিচারিক শৃঙ্খলায় কমতে পারে মামলার চাপ

আপডেট: সেপ্টে ১৯, ২০২৬ : ০৪:৫১ এএম ৩৩ ০
হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি বেড়েছে, বিচারিক শৃঙ্খলায় কমতে পারে মামলার চাপ

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নিয়ে রিট করা বন্ধ হলে মামলার চাপ আরও কমবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আদালতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, আদালতে বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃত অর্থেই মানুষ ন্যায়বিচার পাবেন।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা হয় ৪ হাজার ১১২টি। এ সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি মামলা।

এরপর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৫৯০টি। অর্থাৎ ওই সময়ে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি রিট নিষ্পত্তি হয়েছে। জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।

ব্যক্তিস্বার্থে রিট নিয়ে প্রশ্ন

হাইকোর্টে বিপুলসংখ্যক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থ মামলার (পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন) নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট করা হয়। এর উদ্দেশ্য অনেক সময় আত্মপ্রচার হয়ে দাঁড়ায়। রিট করার পরপরই গণমাধ্যমের সামনে হাজির হওয়ার প্রবণতাকেও তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেন।

সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন, সে বিষয়ে আপিল বিভাগের একাধিক রায় রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব রায়ের পরও বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ ও আদেশ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এতে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এই জায়গায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।

ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতাকেও মামলার চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জমি দখল, জমির সীমানা বা বিল-বাঁওড় নিয়ে বিরোধের মতো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাধারণত নিম্ন আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাইতে হয়। কিন্তু প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে অনেকে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করছেন বলে মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

পাঁচ ধরনের রিট

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে পাঁচ ধরনের রিট করার সুযোগ রয়েছে। এগুলো হলো—

হেবিয়াস করপাস: কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা হলে তাঁকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিতে এই রিট করা যায়।

ম্যান্ডামাস: কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী যে কাজ করতে বাধ্য, তা না করলে আদালত সেই কাজ করার নির্দেশ দিতে পারেন।

সার্টিওরারি: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূত আদেশ দিলে তা বাতিলের জন্য এই রিট করা যায়।

প্রহিবিশন: কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা পরিচালনা শুরু করলে তা বন্ধের নির্দেশ চেয়ে এই রিট করা যায়।

কো-ওয়ারেন্টো: কেউ আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকারি পদে থাকলে ওই পদে তাঁর বৈধতা যাচাইয়ের জন্য এই রিট করা যায়।

জনস্বার্থের রিটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিটের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ওই রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন।

এরপর বিভিন্ন জনস্বার্থের মামলায় হাইকোর্টের রায় ও আদেশের মাধ্যমে নদী রক্ষা, দখলদার উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও পাহাড় কাটা রোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষাতেও জনস্বার্থের রিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে একজনের করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল পেয়েছেন দেশের হাজারো মানুষ।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!