দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এ লক্ষ্যে করের আওতা বাড়ানো, কর পরিপালন জোরদার, ডিজিটাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের পরিকল্পনায় ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামোর মাধ্যমে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসকে আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় করদাতার তথ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের তথ্য একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এনবিআর বলছে, শুধু করের হার বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। করের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার এবং করদাতাদের পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। রূপরেখায় স্বল্পমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসে এনবিআর থেকে। গত ২৫ বছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশির ভাগ সময় ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে তা প্রায় ১০ শতাংশে উঠলেও পরে কমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।
রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও করদাতা সেবা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এনবিআর।
প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় প্রতিটি করদাতার জন্য স্বতন্ত্র মাস্টার ডেটাবেজ, অভিন্ন ডেটা ডিকশনারি ও সিস্টেম ইনভেন্টরি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব নীতি সচিবালয় গঠন, কর-ব্যয়ের রেজিস্টার এবং নীতির আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে বাধ্যতামূলক টেমপ্লেট চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথম তিন বছরে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, গ্রাহক ও মামলা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ব্যবস্থা, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে করদাতার তথ্য যাচাই এবং কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের সমন্বিত তথ্যভান্ডার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কাস্টমসের ক্ষেত্রেও আমদানি-রপ্তানিকারকদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে পণ্যের মূল্যায়ন, ভ্যাট ও আয়কর-সংক্রান্ত ঝুঁকির তথ্য সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছে এনবিআর। পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরে কর পরিপালন বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত এবং জালিয়াতি শনাক্তে উন্নত বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
এনবিআর জানিয়েছে, রাজস্ব নীতির মাধ্যমে শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়তা দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, নির্দিষ্ট খাতে ভ্যাট অব্যাহতি, বিভিন্ন খাতে কম আয়কর হার ও কর অব্যাহতি, কাস্টমস অটোমেশন এবং সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, রাজস্ব আহরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ জোরদার করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এই সক্ষমতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!