অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির কাঁচামাল সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো আমদানি করে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাব্য চিত্র পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।
সিআইসির ঝুঁকিভিত্তিক যাচাইয়ের পর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একটি চালানের খালাস স্থগিত করা হয়। পরে ওই চালান থেকে আমদানি পর্যায়ে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে। এনবিআর বলছে, চালানটির অ্যাসিটেট টো স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারত।
বুধবার এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি
এনবিআর জানায়, সিগারেটের ফিল্টার তৈরিতে ব্যবহৃত সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর কাঁচামাল। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে এ পণ্যের আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এর ব্যবহার ও আমদানির পরবর্তী সরবরাহ নিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে সিআইসি।
এ সময় ইউনিক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাসিটেট টো আমদানির তথ্য সিআইসির নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা পণ্য কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হয়।
ভ্যাট বিভাগ জানায়, নিবন্ধিত ঠিকানায় ইউনিক ট্রেডার্সের কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট দলিলও দাখিল করছে না। এরপর প্রতিষ্ঠানটিকে অস্তিত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সিআইসির যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে দুই কনটেইনারে মোট ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকার তথ্য পাওয়ার পর চালানটির খালাস স্থগিত করা হয়। পরে আমদানি পর্যায়ের ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়।
স্থানীয় পর্যায়েও বড় রাজস্ব ঝুঁকি
সিআইসি জানিয়েছে, আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব ছাড়াও স্থানীয় ব্যবহারের সঙ্গে বড় অঙ্কের রাজস্ব সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
সিগারেট উৎপাদনকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মূসক-৪.৩ ফরমে উল্লেখিত উপকরণ-উৎপাদ সহগ বিশ্লেষণ করে সিআইসি দেখতে পেয়েছে, এক কেজি অ্যাসিটেট টো দিয়ে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব।
সে হিসাবে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো দিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা যেত। ১০ শলাকার এক প্যাকেট হিসেবে এ পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট সিগারেট উৎপাদন সম্ভব।
মাঝারি শ্রেণির সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ ধরে সিআইসি প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে, এতে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
উচ্চ শ্রেণির সিগারেটের ক্ষেত্রে একই হিসাবে সম্ভাব্য রাজস্ব সংশ্লিষ্টতার পরিমাণ প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
আরও চার প্রতিষ্ঠানের তথ্য
সিআইসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স আলোচ্য চালানসহ মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৭ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে।
অ্যাসিটেট টো আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানায়ও বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআইসির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অ্যাসিটেট টো আমদানি করে পরে তা অবৈধভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর করে থাকতে পারে।
এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা অ্যাসিটেট টোর প্রকৃত ব্যবহারকারী, সরবরাহের গন্তব্য, বিক্রয়, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে বর্তমানে যাচাই-বাছাই চলছে।
এনবিআর সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটগুলোকে অ্যাসিটেট টোর সরবরাহ চেইন যাচাই করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।
সিআইসি বলছে, তাদের এ উদ্যোগে একটি চালান থেকেই ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকি প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!