অর্থনীতি

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

আপডেট: অক্টো ০৭, ২০২৬ : ০৫:০২ এএম ৫ ০
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

শক্তিশালী প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাংকিং, জ্বালানি ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব খাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমেছে। জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।

তিন খাতে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ

রাজধানীতে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক কার্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনীতির আরও অবনতি ঠেকিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানি সংকট কমানো, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক।

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ

জ্বালানি খাত স্থিতিশীল করতে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অবকাঠামো উন্নত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা উন্নত করা এবং সিস্টেম লস কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলেছে সংস্থাটি।

ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের সুপারিশ

আর্থিক খাতের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই দ্রুত শেষ করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। কার্যকারিতা বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংক পুনর্গঠনের পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়াতে আইন ও বিধিবিধান সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক ছাড় ধীরে ধীরে প্রত্যাহার, খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো তৈরি, আমানত সুরক্ষা তহবিলের ব্যবহার স্পষ্ট করা এবং জরুরি তারল্য সহায়তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

করব্যবস্থা সহজ করার পরামর্শ

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনের দায়িত্ব আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সমন্বিত করদাতা তথ্যভান্ডার ও কর শনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমে কর প্রশাসন ডিজিটাল করার পাশাপাশি যথাযথ লক্ষ্যভিত্তিক নয়—এমন কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ভ্যাট ব্যবস্থাও সহজ করার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, ভ্যাটের হার একীভূত ও অব্যাহতি কমানোর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও সম্পত্তি কর প্রশাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে।

দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষায় নজর দেওয়ার আহ্বান

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেকই এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।

সীমিত সরকারি অর্থ প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বা গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও ভালোভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে অতিরিক্ত ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে রাখা সম্ভব। আর ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা ও খাদ্য কর্মসূচি সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।

এ জন্য ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, প্রস্তাবিত কৃষক কার্ডসহ অন্যান্য সহায়তা ও ভর্তুকি কর্মসূচির সংযোগ স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশ হতে পারে

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলেও অঞ্চলটির অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে বৈশ্বিক চাপ বাড়ায় ২০২৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশগুলোকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।

তিনি বলেন, দ্রুত সম্প্রসারিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল থেকে সুযোগ নিতে হলে দক্ষতা, অবকাঠামো এবং শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। তবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এ অঞ্চলে এর ব্যবহার এখনো অনেক পিছিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কৌশলগত ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করতে পারে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!