অর্থনীতি

আইপিও নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনছে বিএসইসি

আপডেট: অক্টো ১৩, ২০২৬ : ০৫:০৪ এএম ৪ ০
আইপিও নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনছে বিএসইসি

পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানো ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই জনসাধারণের মতামতের জন্য তা কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

একই সঙ্গে বড় কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া, ডেরিভেটিভস বাজার চালু, মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ এবং ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

তিনি বলেন, বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে এমন নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা চলছে, যাতে পুঁজিবাজারের বাস্তব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে।

আইপিওতে আর্থিক তথ্য যাচাই কঠোর হচ্ছে

প্রস্তাবিত আইপিও নীতিমালায় কোম্পানির নিরীক্ষা ও আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। নিরীক্ষকদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাতে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।

বিদ্যমান নীতিমালায় পুঞ্জীভূত লোকসানের বিষয়ে থাকা কঠোর শর্ত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানা এবং হোটেলের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর প্রকল্পে ব্যবসার শুরুর দিকে লোকসান হতে পারে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তালিকাভুক্তির শর্তে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে আগের ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। তবে এ পরিবর্তনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে।

বড় কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা

পুঁজিবাজারের মূলধন ও গভীরতা বাড়াতে ডাইরেক্ট লিস্টিং বা সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বিএসইসির। বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বড় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির আওতায় আনার বিষয়ে কাজ চলছে।

মাসুদ খান জানান, যেসব কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার অথবা মোট সম্পদের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি, তাদের সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে অতীতে সংঘটিত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইপিও ও ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানি নির্বাচন এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।

ছয় মাসের মধ্যে ডেরিভেটিভস বাজার চালুর লক্ষ্য

পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগপণ্য চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডেরিভেটিভস বাজার চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে। পরবর্তী সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেও এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিটস) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব বিনিয়োগপণ্য চালু হলে বিনিয়োগকারীদের বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে এবং পুঁজিবাজারের পরিধি সম্প্রসারিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ওপেন-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডে গুরুত্ব

মিউচুয়াল ফান্ড খাতের বিকাশে ওপেন-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মাসুদ খান। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিউচুয়াল ফান্ড এজেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও সনদ দিয়ে এসব এজেন্ট তৈরি করা হবে। পাশাপাশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক পরামর্শক তৈরির জন্যও নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টদের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে মিউচুয়াল ফান্ডের সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের পেশাদার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ

পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে বিশেষ তহবিলের মেয়াদ ও আকার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বর এ তহবিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি এর আকার সম্প্রসারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

খেলাপি ঋণ ও সুদের হারেও প্রভাবিত পুঁজিবাজার

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করছে বলে মন্তব্য করেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ও পুনঃতফসিল করা ঋণের চাপ ঋণের ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদের হার দ্রুত কমানো কঠিন হচ্ছে, যা পুঁজিবাজারের বিকাশেও প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহের মতো বিষয়গুলোও দেশের পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডিজিটাল প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ

বিনিয়োগকারীদের ডিজিটাল প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ ও লোকসানের আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলছে।

কোনো কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু মুনাফার অঙ্কের ওপর নির্ভর না করে পরিচালন কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণের পরামর্শ দেন তিনি।

মাসুদ খান বলেন, ‘মুনাফা একটি ধারণা, কিন্তু নগদ অর্থই বাস্তবতা।’ কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বুঝতে তার নগদ প্রবাহ বিবরণী (ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট) বিশ্লেষণ করা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব ও যাচাইহীন পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিনিয়োগ শিক্ষাকে কার্যকর করতে শেখার মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান

পুঁজিবাজারের সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, কোনো বক্তব্য বা ঘটনার খণ্ডিত অংশ তুলে না ধরে প্রকৃত তথ্য ও যথাযথ প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করা জরুরি। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের শুধু নেতিবাচক অংশ প্রকাশ না করে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরতে হবে।

মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বিনিয়োগকারীদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা, সঠিক তথ্যপ্রবাহ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা সুদৃঢ় করা সম্ভব।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার তানবীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক, হোসেন সাদাত এবং ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!