চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের ১০৯টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২১ জন বাংলাদেশি কর্মী। একই সময়ে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৫৭৩ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার, যা প্রায় ২৫ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। দেশটিতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০৮ জন। এরপর সিঙ্গাপুরে ৫৩ হাজার ২৯৭, কাতারে ৪২ হাজার ৫১৬, মালদ্বীপে ২৪ হাজার ৭০, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার ৬৬১ এবং কুয়েতে ২০ হাজার ২৫৪ জন কর্মী গেছেন।
এ ছাড়া জর্ডানে ১০ হাজার ১০, ইতালিতে ৭ হাজার ৭৭, পর্তুগালে ৫ হাজার ৩৮৬ এবং ইরাকে ২ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। মরিশাস, সার্বিয়া, ফিজি, বেলারুশ ও রাশিয়াতেও কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী নিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং বিদ্যমান বাজারগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান সরকার শুরু থেকেই নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে প্রধান শ্রমবাজারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়ায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট তৈরি হয়েছে। তারপরও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্য অর্জনে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মাহদী আমিন আরও বলেন, আগের সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান বাজারগুলোতে কর্মী বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভোকেশনাল শিক্ষা এবং বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রেমিট্যান্সে এসেছে ২৫৭৪ কোটি ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ২৫৭৩ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।
মাসভিত্তিক হিসাবে, ফেব্রুয়ারিতে ৩০১ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার, মে মাসে ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার এবং জুনে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
এ ছাড়া জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার, আগস্টে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে এসেছে ৯৯ কোটি ডলার।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি কর্মী অবৈধ হয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কর্মী গেছেন।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে সংকট তৈরি হওয়ায় সরকার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন দেশে সফর করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করছেন।
মালয়েশিয়া ও ওমানে নতুন সুযোগ
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে কলিং ভিসায় কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতাও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শ্রমবাজার-সংক্রান্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে আরও বেশি কর্মী পাঠানোর আশা করছে বাংলাদেশ।
এদিকে ওমানে বিভিন্ন খাতে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। ইতালিও বাংলাদেশিদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে আগ্রহী। দেশটির রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেসান্দ্রো এক বৈঠকে প্রতিবছর প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে পরিবারসহ ইতালিতে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কাতারও বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত মে মাসে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে দেশটির শ্রমমন্ত্রী আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররি ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) টেকনিশিয়ান ও প্লাম্বার নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব খাতে দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) তালিকা কাতারকে দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মী তৈরি করে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার দক্ষ চালক নিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দক্ষ কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হলেও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও সরকারের অগ্রাধিকার। প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
সরকারের আশা, নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং বিদ্যমান বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা আরও বাড়বে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!