কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে শ্রীলঙ্কা। তবে এল নিনোর প্রভাবে চরম আবহাওয়া দেখা দিলে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক করেছে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সোমবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, জলবায়ুসংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ও আর্থিক বাজারের উচ্চ অস্থিরতা দেশটির জন্য কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ
গত বছরের ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহর আঘাতে শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৬৫০ জনের মৃত্যু হয়। এতে কয়েক শ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির কারণে অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি ডলার। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ১৬০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিভিন্ন সম্পদের মূল্য কমেছে এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বেড়েছে। এর মধ্যেই এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়ার আরও অবনতি হলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
২০২২ সালের এপ্রিলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ায় খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির অর্থ জোগাড় করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। ওই বছরের মধ্যেই দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়।
খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকটে কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলে। এর জেরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
২০২৩ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ২৯০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা পাওয়ার পর ঋণ পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে এগোয় দেশটি। পরে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সংকট-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে এসেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশঙ্কা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে এই অগ্রগতি আবারও বাধার মুখে পড়তে পারে।
ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া বিভাগ ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। এরপর আগামী বছরের শুরুর দিকে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এল নিনোসংশ্লিষ্ট বর্তমান আবহাওয়ার পরিস্থিতির কারণে ঋণের গুণগত মানের অবনতি ঘটতে পারে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।’
কী এই এল নিনো?
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিতে পারে, আবার কোথাও দেখা দিতে পারে খরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে চরম আবহাওয়া সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডলে বেশি শক্তি ও জলীয় বাষ্প জমা হতে পারে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!